বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

0

দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধির হার ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে। সর্বশেষ হিসাবে, গত বছরের ডিসেম্বরে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

এখন যাঁরা বাড়তি ঋণ নিতে চান, তাঁদের অনেককে ব্যাংক টাকা দিতে আগ্রহী নয়। আর ব্যাংক যাঁদের ঋণ দিতে আগ্রহী, তাঁদের অনেকেরই আপাতত টাকার দরকার নেই।

বেসরকারি খাতে কম ঋণ মানে হলো কম বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যও কমে যাওয়া। ফলাফল—কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধিতে ভাটা। তাই সংসারের জন্য ঋণ খারাপ হলেও অর্থনীতির জন্য ভালো, যদি সেটা ফেরত আসে।

ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আসলে এখন ঋণের চাহিদাই নেই। সাম্প্রতিক কালে যেসব খাতে ভালো ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সেখানে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না।’

ঋণ পরিস্থিতি কী?

ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের প্রবৃদ্ধি চিত্র যেন বছরে বছরে পাল্টে যাচ্ছে। ২০১৭ ব্যাংকে তারল্য অনেক বেড়ে গিয়ে ঋণের সুদের হার কমে যায়। ২০১৮ সালের শেষ দিকে ব্যাংকঋণ দেওয়ার মতো টাকার অভাব দেখা যায়। কারণ, আমানত কমে গিয়েছিল। তখন ব্যাংকগুলোর চাপে ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) সমন্বয়ের সীমা দফায় দফায় বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

২০১৮ সালের নভেম্বরে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ, তবে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয় ১৪ শতাংশের বেশি। ঠিক এক বছর পর গত নভেম্বর আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। তবে ওই মাসে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে হয় ১০ শতাংশ।

সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি।

বর্ধিষ্ণু অর্থনীতিতে ব্যাংকের ঋণ বাড়তেই থাকে। ২০০৯-১০ অর্থবছর শেষে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪ শতাংশের বেশি। বছরওয়ারি হিসেবে, এরপর তা সব সময়ই ১০ শতাংশের বেশি ছিল। এমনকি ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ডিসেম্বরের হিসাবেই কেবল তা দুই অঙ্কের নিচে নামল।

অবশ্য সরকারের ঋণ ব্যাপকভাবে বাড়ছে। গত জুলাই থেকে ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। পুরো বছরে সরকার ৪৭ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছিল।

ঋণ কেন কম?

ব্যাংকের ভালো গ্রাহক হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ীরা বাড়তি ঋণ না নেওয়ার কারণ মোটাদাগে তিনটি—সুদের হার বেশি, স্থানীয় বাজারে পণ্যের চাহিদা কম এবং রপ্তানি খাতে ভাটার টান।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস শেষে রপ্তানি আয় প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে আমদানি কমেছে প্রায় ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতিও বাড়তি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ চাপে রয়েছে। বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী পণ্যের চাহিদা ততটা তেজি না থাকার কথা বলছে।

পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত সিমেন্ট, ইস্পাত, জুতা ও চামড়াজাত পণ্য, নিত্যব্যবহার্য এবং ভোগ্যপণ্য খাতের ১৭টি নেতৃস্থানীয় কোম্পানির গত জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তথ্য বলছে, আলোচ্য সময়ে ১০টির পণ্য বিক্রি কমেছে। তিনটির প্রবৃদ্ধি আছে, তবে খুবই নগণ্য। অবশ্য চারটি ভালো করেছে। পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত নয় এমন কয়েকটি কোম্পানিও বিক্রি কমে যাওয়ার কথা বলছে।

দেশের সুপরিচিত শিল্পগোষ্ঠী এসিআইয়ের এম আনিস উদ দৌলা বলেন, পণ্যের চাহিদা যদি ততটা না থাকে, তাহলে কেন একজন ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে বিক্রির সক্ষমতা বাড়াবেন?

নিজ কার্যালয়ে গত ২৭ জানুয়ারি আমাদের সঙ্গে আলাপকালে আনিস উদ দৌলা ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার জন্য পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেন। যেগুলোর মধ্যে সুদের উচ্চ হারের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ, রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং স্থানীয় বাজারে চাহিদায় ভাটার কথা জানান, যা আগেও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মতে, পঞ্চম কারণটি হলো, বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো গত ১০ বছরে ব্যবসা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করেছে। সেটা এখন টেকসই করার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।

এখানে উল্লেখ করা দরকার, ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে নিজেদের ব্যবসার পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রতিবেদনে এসিআই উল্লেখ করেছে, তাদের আর্থিক ব্যয় ৩৮ শতাংশ বেড়ে ১০৪ কোটি টাকায় উঠে গেছে। ফলে সুদের হার বেড়ে যাওয়ার বড় ভুক্তভোগী এসিআই। প্রতিষ্ঠানটির ফাইন্যান্স বিভাগের একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, দুই বছর আগে তাঁদের গড় সুদের হার ৮ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। এখন ঋণ নিতে হচ্ছে ১২ শতাংশ বা তার বেশি হারে।

একই ধরনের মতামত দেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি শামস মাহমুদ। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা এত দিন উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বেশি নজর দিয়েছেন। এখন উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং ব্যবসা টেকসই করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।

সমাধান কী?

সিমেন্ট, ইস্পাত, বস্ত্র, সিরামিক, ওষুধ, কাগজ, পাট ইত্যাদি খাতে এত দিন যে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে, তা মোটামুটি সাধারণ প্রযুক্তির। এসব খাত এখন চাহিদার তুলনায় বাড়তি উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে ভারাক্রান্ত। উদ্যোক্তাদের মুনাফা কমে গেছে।

তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে কোথায়? বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো বিপুল বিনিয়োগ করে এখন ধীরে চলো নীতিতে। তাহলে বিনিয়োগ করবে কে?

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এখন দরকার নতুন পণ্যে বিনিয়োগ এবং নতুন প্রযুক্তি। দরকার নতুন উদ্যোক্তা গোষ্ঠী। এ জন্য সমাধান হতে পারে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো। সমস্যা হলো নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ দেয় না। বিদেশি বিনিয়োগও ততটা বাড়ছে না।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিনিয়োগ সীমা বেঁধে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এতে বড়রা ওই সব খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা গড়ে উঠবে। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কারখানা করার উপযোগী দ্রুত করতে হবে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। এ সময়ে মোট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৪০ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৬ শতাংশের মতো কম।

ঋণ ও আমানতের সুদের হার নয়-ছয় করা নিয়ে দেড় বছর ধরে নানা কর্মকাণ্ডের পর এখন সরকার বলছে, আগামী এপ্রিলে তা কার্যকর হবে। ব্যবসায়ীরা কি সেটির অপেক্ষায়? আনিস উদ দৌলা বলেন, ‘সুদের হার যদি কমে, সেটা হবে খুবই ভালো খবর। তাহলে আমরা আবার আমাদের পরিকল্পনায় থাকা বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে নজর দেব।’

অবশ্য এমটিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনে করেন, সুদের হার ৯ শতাংশ হলেই বিনিয়োগ বাড়বে, সে আশা করা যায় না, বরং আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনায় ব্যাংকে আমানত কমবে; যা ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেবে।

Leave a Reply