ব্যক্তি আমানতকারীদের জন্য সুখবর আসছে!

0

আমানতকারীদের জন্য সুখবর। ব্যক্তি আমানতকারীদের জন্য কিছুটা হলেও সুখবর আসছে। আর সেই সুখবরটি হলো, ব্যক্তি আমানতের সর্বোচ্চ সুদহার (ক্যাপ পদ্ধতি) বেঁধে দেওয়া হচ্ছে না। এটা বাজারের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যক্তি আমানতের সুদহার বেঁধে দেওয়ার পক্ষে নয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ ব্যক্তি আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ বেঁধে দেওয়া হলে আমানতকারীরা ব্যাংকবিমুখ হয়ে পড়তে পারে। আবার দুর্বল ভিত্তির ব্যাংকগুলোর নতুন আমানত পাওয়া ও বিদ্যমান আমানত ধরে রাখা কঠিন হবে। কারণ তখন নতুন-পুরনো সব আমানতকারীই শক্তিশালী ভিত্তির ব্যাংকেই টাকা রাখতে বেশি আগ্রহী হবে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সার্বিক ব্যাংকিং খাতের ওপর। এই বিবেচনায় ব্যক্তি আমানতের ক্ষেত্রে ক্যাপ না বসানোর পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী মাসে শুধু ঋণের সুদেই ক্যাপ বসিয়ে সার্কুলার জারি করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে।

এদিকে ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই সব ধরনের ব্যক্তি আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশ কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি। তবে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে এখনো কোনো সার্কুলার জারি না করায় এটি মানতে সব ব্যাংক বাধ্য নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিক্রয় রেট (লেন্ডিং রে) বেঁধে দিলে ক্রয় রেট (আমনতের রেট) বেঁধে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। কারণ এখানে জরুরি হলো লেন্ডিং রেট। আর আমরা তো লেন্ডিং রেটে ক্যাপ বসিয়েই দিচ্ছি। আর আমানতের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোই ঠিক করবে তারা কত রেটে তহবিল নেবে। অবশ্যই বিক্রয় রেট মাথায় রেখেই এটা তাদের ঠিক করতে হবে। কোনো ব্যাংক যদি ৬ শতাংশের জায়গায় ৭ শতাংশ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়, এতে সমস্যার কিছু নেই। খেলাপি ঋণ ও অন্য পরিচালন ব্যয় কমিয়ে এটা করতে পারে তারা। আবার কেউ ৬ শতাংশের কমেও আমানত নিতে পারে। তাই এখানে দর-কষাকষির সুযোগ রাখার পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে আমানতকারী ও ব্যাংক উভয়ই লাভবান হবেন।’

ব্যক্তি আমানতে ৬ শতাংশ সুদ বেঁধে দেওয়া হলে আমানতকারীরা নিরুৎসাহ হবেন—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরাও।

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান, ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড বাদে সব ঋণের সুদহার হবে ৯ শতাংশ। এ ছাড়া সব ধরনের আমানতের সর্বোচ্চ সুদের হার ৬ শতাংশ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সার্কুলার জারি করা হবে। এখন পর্যন্ত ওই সার্কুলার জারি না হলেও গত ২৮ জানুয়ারি এবিবির এক বৈঠকে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ব্যক্তি আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে এবিবির চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখার সম্প্রতি বলেন, ‘১ ফেব্রুয়ারি থেকে ব্যক্তি আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশ কার্যক্ররের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা চাচ্ছি ধাপে ধাপে ব্যক্তি আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে। তবে ১ ফেব্রুয়ারি সব ব্যাংক ৬ শতাংশে নামাবে কি না সেই নিশ্চয়তা এবিবি দিতে পারে না। কারণ এবিবি কোনো রেগুলেটর না। তাই কাউকে বাধ্য করার ক্ষমতাও এবিবির নেই।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে দেশের ৬০টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ২৫টি ব্যাংক ব্যক্তি আমানতকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহে গড়ে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ দিয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি, বিশেষায়িত দুটি, বিদেশি চারটি ও বেসরকারি ১৩টি ব্যাংক। বাকি ৩৩টি ব্যাংক আমানতকারীদের গড়ে সাড়ে ৯ শতাংশ সুদ দিয়েছে। আগের মাস ডিসেম্বরে ৬০টি ব্যাংকের মধ্যে ২০টি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ দিয়েছিল। এর মানে এক মাসের ব্যবধানে পাঁচটি ব্যাংক তাদের আমানতের সুদ কমিয়ে এনেছে। আর চলতি মাস থেকে বাকি ব্যাংকগুলোও তাদের আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

এর আগে ২০ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা এবং এর সর্বোচ্চ সুদের হার ৬ শতাংশ বেঁধে দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই আদেশ পরিপালনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সব আমানতের ক্ষেত্রে সুদের হার সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ যদি হয়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো আরো কম দেওয়ার চেষ্টা করবে। ধরলাম, যদি ৬ শতাংশও দেয়, তাহলেও ব্যাংকে টাকা রেখে প্রকৃতপক্ষে কোনো মুনাফা ঘরে তুলতে পারবে না মানুষ। কারণ এখন মূল্যস্ফীতির হারই প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি। তার ওপর উৎসে কর ও আবগারি শুল্কের বিষয় রয়েছে। সব মিলে ব্যাংকে টাকা রেখে প্রকৃত মুনাফা ঘরে তোলা কঠিন হবে। এতে নিঃসন্দেহে ব্যক্তি আমানতকারীরা নিরুৎসাহ হবেন। ফলে ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।