পিয়ন কেরানি প্রহরী ও অফিস সহকারী থেকে ম্যানেজার

0

এক সময়কার পিয়ন, সশস্ত্র প্রহরী (আর্মগার্ড), কেরানি (সার্চক্লার্ক), কেরানি (মুদ্রাক্ষরিক), শ্রুতিলেখক (স্টেনোটাইপিস্ট) ও শ্রুতিলেখকের (স্টেনোগ্রাফার) মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) শতাধিক শাখা। এর মধ্যে একটি অংশ এরই মধ্যে অবসরে চলে গেছেন, বাকিরা এখনও কর্মরত।

রাকাবের কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ মাধ্যমিক পাসের সনদ নিয়ে ক্যাশ সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগদান করে এখন রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের উচ্চপদে (শাখা ব্যবস্থাপক বা ম্যানেজার, ফতেহপুর) কাজ করছেন নওগাঁ জেলার আব্দুর রহমান, বগুড়া জেলার বিজরুল শাখার দ্বিতীয় কর্মকর্তা (সেকেন্ড অফিসার) সহিদুল আলম এবং কুড়িগ্রামের উলিপুর শাখার দ্বিতীয় কর্মকর্তা একরামুল হক মণ্ডল। সব মিলিয়ে ক্যাশ সহকারী থেকেই শাখা ম্যানেজার এবং সেকেন্ড অফিসার হয়েছেন ৩৪ জন।

মাধ্যমিক পাস সশস্ত্র প্রহরী হাবিবুর রহমান কুড়িগ্রামের রাজীবপুর শাখা ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করে কর্মজীবন শেষ করেন ২০১৬ সালে। এই তালিকায় আরও রয়েছেন বগুড়া উত্তর জোনের বগুড়া শাখার মুখ্য কর্মকর্তা আব্দুল মজিদ ও সিরাজগঞ্জের বেলকুচি শাখার মুখ্য কর্মকর্তা সাকাওয়াৎ হোসেন। শ্রুতিলেখক (স্টেনোটাইপিস্ট) হিসেবে ব্যাংকে যোগদান করে সর্বশেষ নাটোরের হালসা শাখার ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন উচ্চ মাধ্যমিক পাস নুরুল ইসলাম। একই অবস্থা শ্রুতিলেখক আব্দুল আজিজেরও। সর্বশেষ রাজশাহী প্রধান কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) দপ্তরের স্টাফ অফিসার হিসেবে কাজ করেন তিনি।

পিয়ন হিসেবে চাকরিতে যোগদান করে শাখা ম্যানেজার হয়ে কর্মজীবন শেষ করেছেন ১১ জন। তাদের মধ্যে দিনাজপুরের হাকিমপুর শাখার মুখ্য কর্মকর্তা আবুল হাসনাত, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জোনাল কার্যালয়ের মুখ্য কর্মকর্তা নৃপেন্দ্র নাথ রায় ও দিনাজপুর দক্ষিণের জোনাল কার্যালয়ের মুখ্য কর্মকর্তা ওমর আলী মণ্ডল ছিলেন অন্যতম।

শুধু পিয়নই নয়, কেরানি (সার্চ ক্লার্ক) হিসেবে যোগদান করেও শাখা পরিচালনা করেছেন ১৬ জন। তবে তারা সবাই এখন অবসরে। তারা হলেন দিনাজপুরের বুলিয়াবাজার শাখার ম্যানেজার আজিজুর রহমান, বগুড়া উত্তরের ভেলাবাড়ী জোড়াগাছা শাখার দ্বিতীয় কর্মকর্তা আব্দুস সোবহান এবং কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী শাখার ম্যানেজার সুবল চন্দ্র সাহাসহ আরও ১৩ জন।

কেরানি (মুদ্রাক্ষরিক) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন মোট ২৮ জন। তাদের অধিকাংশই ছিলেন শাখা ম্যানেজার। তাদের মধ্যে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি শাখার ম্যানেজার মমিনুল হক, দিনাজপুর দক্ষিণের হাকিমপুর শাখার ম্যানেজার জীতেন্দ্র নাথ রায় এবং রাজশাহী প্রধান কার্যালয়ের আইসিসি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রকাশ কুমার সাহা ছিলেন অন্যতম।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেই সময়ের ব্যবধানে হয়ে উঠেছেন শাখার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। কিন্তু তাদের অধীনেই কাজ করছেন দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা মেধাবী ছাত্ররা। শাখা ব্যবস্থাপকের নামে খোলা ই-মেইল আইডিতে লগ ইন ও আউট কোনোটাই করতে পারেন না তাদের অনেকে, করতে পারেন না জরুরি তথ্যের আদান-প্রদান।

শুধু তাই নয়, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের বিভিন্ন দুর্নীতির মধ্যে জ্যেষ্ঠতা ক্রম লঙ্ঘন করে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ না করা, নীতিবহির্ভূতভাবে ব্যাংকের একই শাখায় তিন বছরের অধিক অবস্থান এবং গ্রামের স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে রাজধানীতে সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) হিসেবে পদোন্নতির মতো ঘটনাও রয়েছে। এসব অনিয়মে কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাকাবের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, গুটিকয়েক সদস্যের একটি চক্রের মাধ্যমে এসব দুর্নীতি সম্পন্ন হয়ে আসছে বহুদিন থেকে। দিনের পর দিন এ ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি আরও বাড়ছে।

কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে জ্যেষ্ঠতা তালিকার সামনের দিকে থাকা কর্মকর্তাদের বাদ রেখেই ২৪৫ নম্বর সিরিয়াল থেকে শুরু হয় পদোন্নতি। বঞ্চিত করা হয় মেধাতলিকায় ওপরে থাকা অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের। এসব দুর্নীতি ঢাকতে গত ছয় বছর ধরে কোনো জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ করেনি রাকাব। সর্বশেষ এই তালিকা প্রকাশ করা হয় ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। নতুনভাবে এই তালিকা প্রকাশ না করেই অভ্যন্তরীণ পদোন্নতি দিয়ে যাচ্ছে ব্যাংকটি। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয় প্রণীত রাকাবের ২০১৫ সালের পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ী কর্মকর্তাদের অবগতির জন্য সময়ে সময়ে জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ করার বিধান রয়েছে।

এছাড়া রাকাবের প্রধান কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শাখায় নীতিবহির্ভূতভাবে অনেক কর্মকর্তা তিন বছরের অধিক সময় ধরে কর্মরত রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রধান কার্যালয়ের কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এসপিও) কামরুল হাসান, রেজা তৌফিক, রাকাব চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী মুকুল বর্ধন, দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর মধ্যপাড়া শাখার আজমীর হোসেন, পাবনা জেলার চাটমোহর শাখার দ্বিতীয় কর্মকর্তা গোলাম আযম, ঠাকুরগাঁও জেলার চরখোচাবাডিহাট শাখার ফজলে রাব্বী, গোগর হাট শাখার মিজানুর রহমান ও ঢাকা করপোরেট শাখার শফিকুল ইসলাম অন্যতম। শুধু তাই নয়, আইটি ও আইনসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল বিভাগগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক সনদ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন অনেক কর্মকর্তা।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কর্মীদের বেতন বৃদ্ধিতেও চলছে নানা অনিয়ম। ২০১০ সালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে একসঙ্গে ৫৪ জন ব্যাংকার যোগদান করলেও এ বছর চারজনের বেতন বৃদ্ধি হয়েছে অন্য ৫০ জনের চেয়ে বেশি। নতুন করে এই চারজনের বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা, যা অন্য ৫০ জন সহকর্মীর তুলনায় দুই হাজার ২৭০ টাকা বেশি। এই চারজন কর্মকর্তা হলেন রংপুর জেলার মিঠাপুকুর শাখার ব্যবস্থাপক আব্দুল হামিদ মণ্ডল, রাজশাহী জেলার প্রধান কার্যালয়ের আইসিটি বিভাগের ঊর্ধ্বতন মুখ্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান, রংপুর পরশুরাম শাখার ব্যবস্থাপক অম্বরীষ মহন্ত ও রাজশাহীর অডিট অফিসার মো. ফরিদ আহমেদ।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাকাবের চেয়ারম্যান রইসুল আলম মণ্ডল শেয়ার বিজকে বলেন, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারি না। তবে ব্যাংকের প্রবিধানমালা লঙ্ঘন করে কর্মকর্তাদের পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে কেন জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না, সে বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে।

জানতে চাইলে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) একেএম সাজেদুর রহমান খান বলেন, রাকাবের সমস্যা দীর্ঘদিনের। তবে খুব দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ব্যাংকটিকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছি। যেসব উচ্চশিক্ষিত কর্মকর্তা নতুন করে ব্যাংকে যোগদান করছেন, দু-এক বছর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিচ্ছি। একটা সময় অল্প শিক্ষিত লোক ছাড়া ব্যাংক পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল ছিল না। তাদের অনেকেই অবসরে চলে গেছেন। অল্প কিছু বাকি আছে। তবে এখন অবাধ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষিত লোকদের গুরুত্ব দেওয়া হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) রুহুল আজাদ জানান, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের পদোন্নতিতে অনিয়মের বিষয়টি অজানা। কারণ এখন পর্যন্ত ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেননি। যদি কোনো অনিয়ম খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের জুনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ৩৮৩টি শাখার মধ্যে ১৯৫ শাখাই লোকসানে রয়েছে। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের (২০১৯-২০) রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের পরিচালন লোকসানের পরিমাণ ৬০২ কোটি টাকা। এ সময়ে মোট পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকটি। এর মধ্যে ৩১ শতাংশই খেলাপি, অঙ্কে যার পরিমাণ এক হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এটা কোনো ভালো লক্ষণ নয়। হয়তোবা নীতিমালা উপেক্ষা করে এটি করা হয়েছে। তা না হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে একটি ছেলে কীভাবে ব্যাংকের ম্যানেজার হয়, বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। এছাড়া ৩৮৩ শাখার মধ্যে ১৯৫টি শাখাই লোকসানে পড়ে আছে। এতেই বোঝা যাচ্ছে ব্যাংকটিতে কী হচ্ছে! সুতরাং লোকসানি শাখা লাভজনক করতে না পারলে বন্ধ করে দেওয়াই ভালো।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এ ধরনের লোক দিয়ে ব্যাংক চলে না। এখানে নিশ্চয় স্বচ্ছতার ঘাটতি আছে। এখন সময়ের দাবিÑরাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংককে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত (মার্জার) করে দেওয়ার। তা না হলে ব্যাংকটির ভাগ্য কখনও পরিবর্তন হবে না। তাছাড়া যে উদ্দেশ্যে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাও অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

Leave a Reply