ফার্স্ট সিকিউরিটি এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ ইসলামী ব্যাংক

২০১৫ সাল থেকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ৩৯ বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে তিনি পালন করেছেন একাধিক ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আজ প্রতিষ্ঠার দুই যুগে পদার্পণ করছে ইসলামী ধারার ব্যাংকটি। দীর্ঘ এ পথচলায় ব্যাংকটির অর্জনসহ দেশের ব্যাংক খাতের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাছান আদনান।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

প্রতিষ্ঠার দুই যুগে পদার্পণ করছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠার এ দিনে আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের যাত্রা ১৯৯৯ সালের ২৫ অক্টোবর। ব্যাংকটির যাত্রা হয়েছিল প্রচলিত ধারার ব্যাংকিং দিয়ে। পরে ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ধারার ব্যাংকে রূপান্তর হয়। পরিচালনার ধরন ও পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের পর গত এক যুগে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক প্রতিটি সূচকে ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যে এ ব্যাংকের অবস্থান এখন দ্বিতীয়। একটি দেশের অর্থনীতির প্রধানতম স্তম্ভ হচ্ছে ব্যাংক খাত। দেশের অন্যতম ব্যাংক হিসেবে অর্থনৈতিক যুদ্ধে আমরা শামিল রয়েছি অগ্রসর সৈনিকের মতো। গত দুই বছর বাংলাদেশসহ বিশ্ব অর্থনীতি একটি দুর্যোগের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। এ দুর্যোগেও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক তার অগ্রযাত্রা বরাবরের মতো অব্যাহত রেখেছে। এরই মধ্যে যে আর্থিক ভিত, আস্থা, বিশ্বাস ও সুনাম আমরা অর্জন করেছি, তার ওপর দাঁড়িয়ে ব্যাংকটি অনন্ত পথ পাড়ি দিতে পারবে।

দীর্ঘ এ পথচলায় ব্যাংকের অর্জন কী?

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলজুড়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বিস্তৃতি। জনসাধারণের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য আমরা এরই মধ্যে ২০০টি শাখা চালু করেছি। এছাড়া ১৫২ উপশাখা, ৮৪ এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ও দেশব্যাপী ২০৯টি নিজস্ব এটিএম নেটওয়ার্ক স্থাপনের মাধ্যমে আমরা দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। শহরের বাইরে যেসব শাখা আমরা চালু করেছি, সেগুলোর অবস্থান একেবারেই গ্রামে। প্রত্যন্ত গ্রামের শাখাগুলোতেও অর্ধশত কোটি টাকার বেশি আমানত জমা হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী আমরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে বিনিয়োগ সহায়তাও দিচ্ছি। আমাদের কাছে বর্তমানে গ্রাহকদের ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত সঞ্চিত রয়েছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি এখন ৫৮ হাজার কোটি টাকা সম্পদের ব্যাংক, যা ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহৎ। গ্রাহকদের আস্থা ও ব্যাংকের সুদৃঢ় আর্থিক ভিতের কারণে এ অর্জন সম্ভব হয়েছে।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আমানত ও বিনিয়োগ প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাই।

সমাজের সব শ্রেণী-পেশা ও বয়সের মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আমানত ও বিনিয়োগের প্রডাক্টগুলো সাজানো হয়েছে। আমাদের রয়েছে আল ওয়াদিয়াহ চলতি হিসাব, মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব, স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের জন্য অংকুর ও আলো, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রজন্ম ও উদ্দীপন, শ্রমজীবী মানুষের জন্য মেহনতি, প্রবাসীদের জন্য স্বদেশ, নারীদের জন্য মহীয়সী, গৃহিণীদের জন্য ঘরণী, ষাটোর্ধ্ব সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য প্রবীণ ও মুরব্বিসহ মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী আমানত প্রকল্প। এর মধ্যে নারী ও প্রবীণদের জন্য চালু করা আমানত প্রকল্পগুলো এরই মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে এসএমই, কৃষি, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য চাহিদা মোতাবেক বাই-মুরাবাহা, বাই-মুয়াজ্জাল, বাই-সালাম, বাই-ইসতিশনা, মুদারাবা, মুশারাকা ও এইচপিএসএমভিত্তিক বিনিয়োগ প্রকল্প। বড় করপোরেট বিনিয়োগ নয়, বরং এ মুহূর্তে আমরা সিএসএমই ও কৃষি খাতকে প্রাধান্য দিয়ে বিনিয়োগ করছি। দেশের তরুণ, সৎ ও দক্ষ উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা সবসময়ই প্রস্তুত।

চলতি বছরে গ্রাহকসেবায় নতুন কী সংযোজন করেছেন?

আমরা ২০২২ সালে গ্রাহকদের সুবিধার্থে নতুন কিছু ডিপোজিট স্কিম চালু করেছি। এর মধ্যে রয়েছে চাকরিজীবীদের জন্যে অবসর সময়ের সুরক্ষায় ‘সঞ্চয়ে সুখ’, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাসিক সঞ্চয় স্কিম ‘মার্চেন্ট’ এবং সীমিত সময়ের জন্য গ্রাহকদের আকর্ষণীয় মুনাফা দিতে নিয়ে এসেছে ‘উৎসব’। যা দেশব্যাপী গ্রাহকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষদের বিনিয়োগ সুবিধার্থে নতুন কিছু ইনভেস্টমেন্ট স্কিমও নিয়ে এসেছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। নারী উদ্যোক্তাদের জন্যে ‘স্বাবলম্বী’, তরুণ উদ্যোক্তদের জন্য ‘প্রচেষ্টা’, গ্রামীণ কৃষি জনপদের জন্য ‘সোনালী স্বপ্ন’ এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অর্থায়নে নিয়ে এসেছি ‘উদ্যমী’। গ্রাহকদের সেবার মান বাড়ানো ও আরো বেশি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত নতুন কিছু করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

দুই যুগে পদার্পণ উপলক্ষে গ্রাহকদের জন্য নতুন কোনো বার্তা আছে?

জনসাধারণের দোরগোড়ায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য আমরা নিয়ে আসছি ‘ফার্স্ট ক্যাশ’। এটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে আমরা গ্রাহকদের হাতে তুলে দিচ্ছি। বাজারে প্রচলিত অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, অধিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে সব মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা নিয়ে পাশে থাকবে ফার্স্ট ক্যাশ।

গ্রাহকসেবার মান বাড়াতে আপনাদের ব্যাংক কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হিসেবে ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক তার ডিজিটাল ব্যাংকিং প্লাটফর্মকে আরো সম্প্রসারিত করছে। সকল প্রকার ব্যাংকিং কার্যক্রমের জন্য গ্রাহকদের জন্য রয়েছে আমাদের সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধা। এফএসআইবিএল ‘ক্লাউড অ্যাপস’-এর ফ্রিডম ফিচারের মাধ্যমে একজন গ্রাহক ঘরে বসেই ‘ই কেওয়াইসি’ ফরম পূরণসহ নিজেই নিজের অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। এছাড়া আমাদের এ অ্যাপস ব্যবহার করে সব ধরনের মোবাইল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করা যাবে। যেমন নগদ ও বিকাশে ব্যালান্স ট্রান্সফার; ডিপিডিসি, ডেসকো, ঢাকা ওয়াসা বিল পেমেন্ট ইত্যাদি।

অটোমেটেড চালানের (এ-চালান) মাধ্যমে পাসপোর্টের ফি পরিশোধ, বিআরটিএর ফি পরিশোধ, ট্যাক্স পরিশোধ, ভ্যাট পরিশোধসহ ১৯৬ ধরনের সরকারি চালান ফি দেয়া যায়। আমাদের ভিসা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে সব ধরনের ই-কমার্স প্লাটফর্মে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। এ কার্ডধারীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ডিসকাউন্ট সুবিধা পেয়ে থাকেন। আমাদের সিআরএম মেশিনের মাধ্যমে গ্রাহকরা দ্রুততম সময়ে ক্যাশ জমা ও উত্তোলন করতে পারেন। সব ধরনের সময়োপযোগী সেবা প্রদানের মাধ্যমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকসেবা নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসারে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

গত এক দশকে দেশের প্রচলিত ধারার ব্যাংকিংয়ের তুলনায় ইসলামী ধারার ব্যাংকিং বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তার পরও জনমনে এখনো এ ধারণা কিছুটা রযেছে যে প্রচলিত ও ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবল নামেই আলাদা, কাজে নয়। মূলত তাদের কাছে ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ বার্তা না পৌঁছার কারণেই এমন ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। কীভাবে শরিয়াহর ভিত্তিতে ইসলামী ব্যাংক কাজ করে তা আমরা জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। তৈরি করতে চাই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ। এরই মধ্যে জনসাধারণের মাঝে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পৌঁছে দেয়ার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করছি। ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহ জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে সব পক্ষের সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ-কর্মশালার আয়োজন করছি।

আরও দেখুন:
ব্যাংকিং ব্যবসাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাচ্ছে এমটিবি
ইসলামী ব্যাংক এখন দেশের ব্যাংক খাতের মেরুদণ্ডঃ মুনিরুল মওলা

ব্যাংক পরিচালনায় পর্ষদ থেকে কতটুকু স্বাধীনতা পাচ্ছেন?

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি মোহাম্মদ সাইফুল আলম। তার দক্ষ নেতৃত্বে গঠিত অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ পরিচালনা পর্ষদ সর্বদা ব্যাংকের স্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ খুবই ধর্মভীরু ও উদার। যার ফলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। এ রকম পরিচালনা পর্ষদ পেয়ে আমরা গর্বিত।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button