টাকা লোপাটের অভিনব কৌশল: চেক ছাড়াই টাকা উত্তোলন

0
Money

ব্যাংকের টাকা লোপাটে জালিয়াত চক্র অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে। এর মধ্যে রয়েছে কোনো আদেশ ছাড়াই ব্যাংকের হিসাব থেকে অন্য গ্রাহকের হিসাবে টাকা স্থানান্তর, চেক ছাড়াই গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন এবং ব্যাংক টাকা না পেয়েই পে-অর্ডার ইস্যু।

এমনকি অস্তিত্বহীন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদন এবং পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই ঋণ ছাড়ের ঘটনাও ঘটছে। শুধু তা-ই নয়, টাকা জমা ছাড়াই বৈদেশিক মুদ্রায় ফরেন ড্রাফট ইস্যু, সেবা না দিয়েই ফি আদায় এবং কোনো কাগজপত্র ছাড়াই ভল্ট থেকে নগদ টাকা তুলে নেয়ারও নজির রয়েছে।

জালিয়াতির নানামুখী ধরন নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকিং খাতে নতুন নতুন জালিয়াতির ধরন এবং এগুলো শনাক্ত করার কৌশল নির্ধারণ করতে পরিদর্শকদের পারদর্শী করে তুলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

এর আলোকে যে কোনো ধরনের জালিয়াতির ঘটনা শনাক্ত করতে পরিদর্শকদের বেশ কিছু নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে: যে কোনো শাখা পরিদর্শনে গেলে ভল্টের টাকার হিসাব লেজার বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে, গ্রাহকের নির্দেশনা ছাড়া কোনো টাকা স্থানান্তর হয়েছে কি না, তা দেখতে হবে।

এছাড়া গ্রাহকের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ এলে সেগুলো খতিয়ে দেখার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাত থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে জালিয়াত চক্রের নানা ফন্দি রয়েছে। তারা নিত্যনতুন ফন্দি করে। একসময় ভুয়া চেকের মাধ্যমে টাকা নিত।

এরপর শুরু হয়েছে ভুয়া পে-অর্ডারের দৌরাত্ম্য। এখন সরাসরি এসব ছাড়াই হিসাব থেকে টাকা নিচ্ছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা কঠোর হতে হবে।

সূত্র জানায়, বেসরকারি খাতের একটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকের উত্তরা শাখা থেকে গ্রাহককে ইন্টারনেট সেবা না দিয়েই এর ফি বাবদ অর্থ কেটে নেয়া হয়েছে। পরে গ্রাহক ব্যাংকে অভিযোগ করলে তারা এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

গ্রাহকের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অভিযোগ করলে তারা তদন্ত করে ঘটনার সত্যতার প্রমাণ পায়। পরে ব্যাংক সমপরিমাণ টাকা গ্রাহকের হিসাবে স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়। সেবা না দিয়ে গ্রাহকের হিসাব থেকে ফি কেটে নেয়ার কোনো বিধান নেই।

ব্যাংকে যখন গ্রাহকের নামে রফতানির এলসি আসে, তখন তা ব্যাংক গ্রাহককে মোবাইল ফোনে এসএমএস দিয়ে জানায়। প্রতিটি এসএমএসের জন্য একটি বেসরকারি ব্যাংক ফি নিত ১১শ’ টাকা। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশ দেয় এ খাতে প্রকৃত খরচের বেশি ফি নেয়া যাবে না।

সোহেল গ্রুপের নামে বিদেশ থেকে কোনো রফতানির এলসি ব্যাংকে না এলেও ভুয়া এলসি দেখিয়ে কয়েক দফায় প্রায় ৮৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। এ ঋণ আদায় না হওয়ায় এখন খেলাপি।

কাটার জন্য বিদেশ থেকে পুরনো জাহাজ আমদানি করতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই এলসি খোলা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় জাহাজের মূল্য বেশি দেখিয়ে বিদেশে টাকা পাচার করা হয়েছে।

ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক (বাবুল) চিশতীর মৌখিক নির্দেশে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট মো. শাহজাহানের মালিকানাধীন জাহান ট্রেডার্সের অনুকূলে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার চেক বিতরণ করে।

পরে চিশতীর মৌখিক নির্দেশে জাহান ট্রেডার্সের চলতি হিসাব থেকে চেক ছাড়াই ৭০ লাখ টাকা করে ২টি লেনেদেনের মাধ্যমে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা নগদ করে নিয়ে যায়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী চেক ছাড়া ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তোলার কোনো সুযোগ নেই।

অথচ চিশতীর মৌখিক নির্দেশে চেক ছাড়াই গ্রাহকের টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। যাকে ব্যাংকিং ভাষায় নজিরবিহীন জালিয়াতি বলে ধরা হয়। ফারমার্স ব্যাংকের বাবুল চিশতী একক ক্ষমতা বলে সাইফ পাওয়ার টেকের নামে আড়াই কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করে।

পরবর্তী সময়ে চিশতীর নির্দেশে ঋণের পরিমাণ আরও দেড় কোটি টাকা বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা করা হয়। সমুদয় টাকা তোলার পর ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি হিসাবটি বন্ধ করে দেয়া হয়।

এভাবে টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা যাতে শনাক্ত করা না যায়, সেজন্য হিসাবের লেনদেন রেকর্ড গায়েব করে দেয়া হয়।

গুলশান শাখা থেকে ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ টাকা জমা ছাড়াই চিশতীর মৌখিক নির্দেশে ব্যাংকের সাবেক পরিচালক শরীফ চৌধুরীর নামে ১ কোটি টাকা করে দুটি পে-অর্ডারে ২ কোটি টাকা ইস্যু করা হয়। পরে এ অর্থ চিশতীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাবে নগদায়ন করা হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী নগদ বা শাখার হিসাব থেকে টাকা দিলে তখনই কেবল পে-অর্ডার ইস্যু করা যায়। কেননা পে-অর্ডারই এক ধরনের নগদ টাকা। অথচ এ ক্ষেত্রে টাকা জমা ছাড়াই পে-অর্ডার ইস্যু করা হয়েছে, যা নজিরবিহীন।

একটি সরকারি ব্যাংকের পুরনো ঢাকার ইমামগঞ্জ শাখা এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের মতিঝিল শাখার ভল্ট থেকে টাকা গায়েব হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন পরিদর্শক বলেন, ব্যাংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার নানা ধরনের অভিনব কৌশল প্রয়োগ করে জালিয়াতি চক্র। অনেক ঘটনাই ব্যাংকিং খাতে এভাবে ঘটছে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক কর্মকর্তারাও জড়িত হয়ে পড়ে।

অনেক সময় উপরের নির্দেশে নিচের স্তরের কর্মকর্তারা জালিয়াতির ঘটনা ঘটাতে সহায়তা করে। যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অবৈধ পন্থায় লেয়ারিং করা হয়, সেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই।

সূত্র জানায়, একটি সরকারি ব্যাংক থেকে টাকা জমা না করেই ফরেন ড্রাফট করে বৈদেশিক মুদ্রা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। প্রচলিত নিয়মে ব্যাংকে টাকা জমা করে সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার ফরেন ড্রাফট ইস্যু করার কথা।

ফারমার্স ব্যাংকের ময়মনসিংহ শাখা থেকে একজন কৃষককে ৫০ হাজার টাকা ঋণ দেয়া হয়। পরে ওই কৃষককেই ৪০ লাখ টাকা দেয়া হয়। কৃষক ঋণ নিতে না চাইলেও তার নামে ওই ঋণ ইস্যু করে টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের এলিফেন্ট রোড শাখা থেকে গ্রাহকের হিসাব থেকে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। গ্রাহকের স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় এ কাজটি করা হয়েছে।

এখানের একটি সরকারি ব্যাংকের শাখা থেকে ভুয়া গ্রাহকদের নামে কৃষি ঋণ দিয়ে প্রায় কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। দৈনিক যুগান্তর।

Leave a Reply