ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আগ্রহ বাড়ছে উদ্যোক্তাদের

0

নানা সুবিধায় ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন উদ্যোক্তারা। কেউ পূর্ণাঙ্গ, কেউ বা উইন্ডো খুলে সেবা দিচ্ছেন। সর্বশেষ গত রোববার স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংককে কনভেনশনাল ব্যাংক থেকে পুরোপুরি ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ইসলামী ব্যাংকিংয়ে মানুষের আস্থা বেশি। সাধারণত অনেকে সুদ দেয়া-নেয়ায় আগ্রহী নন। এছাড়া শরিয়াহভিত্তিক লেনদেনে সুযোগ-সুবিধা বেশি। পাশাপাশি ‘কস্ট অব ফান্ডও’ কম। তাই সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছেন উদ্যোক্তারা।

বর্তমানে ইসলামী ধারার একটি ব্যাংক ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৯০ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করার সুযোগ পায়। কিন্তু কনভেনশনাল বা প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে সে সুযোগ কিছুটা কম। কারণ একটি কনভেনশনাল ব্যাংক ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৮৫ টাকা ঋণ বিতরণ করতে পারে।

এছাড়া প্রচলিত ধারার ব্যাংকের মতো ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাড়ে ৫ শতাংশ নগদ জমা রেশিও (সিআরআর) সংরক্ষণ করতে হয়। অথচ প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ১৩ শতাংশ সংবিধিবদ্ধ তারল্য রেশিও (এসএলআর) রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য তা সাড়ে ৫ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংকগুলো যে কোনো সময় আমানতে মুনাফার হার পরিবর্তন করতে পারে। প্রচলিত ধারার ব্যাংক মেয়াদপূর্তির আগে তা পারে না। এসব কারণে প্রচলিত ধারার ব্যাংকের তুলনায় ইসলামী ব্যাংকে মুনাফা বেশি। ফলে অনেক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে ৯৫ ভাগ মানুষ মুসলিম। ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ হারাম এবং ব্যবসা হালাল। তাই অনেক গ্রাহক কনভেনশনাল ব্যাংকে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। সে কারণে অনেক উদ্যোক্তা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে আমানত বেশি পাওয়া যায়। এখানে আস্থা এবং বিশ্বাসের একটা ব্যাপার আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের তুলনায় শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামী ব্যাংকিং আগাচ্ছে দ্রুতগতিতে। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো সুদভিত্তিক ব্যাংকের মতো ঋণ না দিয়ে বিনিয়োগ আকারে অর্থায়ন করে থাকে। গত সেপ্টেম্বরে এ খাতের ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬১ শতাংশ, যেখানে প্রথাগত ব্যাংকসহ গোটা ব্যাংক খাতের বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোয় গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ০২ শতাংশ। ডিসেম্বরে এই হার কিছুটা বেড়ে ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ হয়। গত মার্চে এই হার কিছুটা কমে ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে আসে। গত জুনে বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি আরও কিছুটা কমে ১৩ দশমিক শূন্য আট শতাংশে নেমে আসে। তবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এ খাতের বিনিয়োগের হার কিছুটা বেড়ে ১৩ দশমিক ৬১ শতাংশে উঠে আসে।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তরের চেষ্টা চালিয়ে আসছে স্ট্যান্ডার্ডসহ পাঁচটি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হল- আইএফআইসি, যমুনা, এনসিসি এবং সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স। সম্প্রতি এ তালিকায় যুক্ত হয় এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক। এসব ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করলেও আগে সাড়া মেলেনি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভাগীয় পর্যায়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ৯ ফেব্রুয়ারি পরিচালনা পর্ষদে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সিইও নাসের এজাজ বিজয় বলেন, ‘আমাদের ক্লায়েন্টদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী সাদিক ইসলামী ব্যাংকিং তার সেবার ধরন সম্প্রসারিত এবং শক্তিশালী করার বিষয়ে সব সময় সচেষ্ট। আমাদের অর্থনীতির মতো, বাংলাদেশে ইসলামিক ব্যাংকিংও এগিয়ে চলেছে এবং সুকুকের মতো পণ্যের মাধ্যমে এর প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের দেশের ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি করতে পারি এবং একই সঙ্গে আমাদের ২০৪১ এর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারি। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সাদিক ২০২০ সালে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রমের ১৫ বছর উদযাপন করছে। ইসলামী ব্যাংকিং এগিয়ে নিতে অনেক সার্ভিস প্রথমবারের মতো প্রবর্তন করে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সাদিক। ২০০৭ সালে বাজারে ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড চালু এবং ২০১৯ সালে প্রথম সুকুক লেনদেন শুরু করে। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে নিরলস প্রচেষ্টার পুরস্কারস্বরূপ ‘অ্যাসেট ট্রিপল এ ইসলামিক ফিন্যান্স অ্যাওয়ার্ড’, ‘দ্য ব্যাংকার ইসলামিক ব্যাংক অব দ্য ইয়ার’ এবং ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সের সেরা ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান’সহ একাধিক দেশি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সাদিক।

বর্তমানে দেশে মোট ৬১টি তফসিল ব্যাংক কার্যক্রমে আছে। এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক রয়েছে আটটি। আর ১৭টি ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা বা উইন্ডো রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে- ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্, শাহ্জালাল ইসলামী, এক্সিম, এসআইবিএল, ফার্স্ট সিকিউরিটি, আইসিবি ইসলামিক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এছাড়া ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংকের। তালিকায় আছে বেসরকারি খাতের পূবালী, এবি, দ্য সিটি, প্রাইম, সাউথইস্ট, ঢাকা, স্ট্যান্ডার্ড, প্রিমিয়ার, ব্যাংক এশিয়া, ট্রাস্ট ও যমুনা ব্যাংক। আর সর্বশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর অনুমতি পেয়েছে। এছাড়া বিদেশি মালিকানার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, আল-ফালাহ ও এইচএসবিসি ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকিং রয়েছে।

দেশের পুরো ব্যাংক খাতের আমানত ও বিনিয়োগ উভয় দিক দিয়েই এক-চতুর্থাংশ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর দখলে। সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের স্থিতি ছিল ১০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ১১০ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের প্রায় ২৪ শতাংশ।

অন্যদিকে সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতের বিনিয়োগকৃত অর্থ বা ঋণের স্থিতি ছিল ১০ লাখ ১৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা, যা গোটা ব্যাংক খাতের বিনিয়োগের ২৪ শতাংশেরও বেশি।

রেমিটেন্স আনার ক্ষেত্রেও এগিয়ে আছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো। গত জুনে রেমিটেন্সের ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ এসেছিল এ খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। সেপ্টেম্বরে এই হার বেড়ে হয়েছে ৩১ দশমিক ১২ শতাংশ।