জরুরি সেবাদানে ব্যাংকার: তার সেবা করবে কে?

0

ফ্রন্টলাইনার হিসেবে গত বছর থেকে এই কোভিড পরিস্থিতিতে ব্যাংকার গণ যেভাবে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে সেবা দিয়েছেন, সেভাবে স্বীকৃতি তো পানইনি, কখনো কখনো এমনটিও মনে হয়েছে সবচাইতে থ্যাংক্সলেস জবগুলোর মধ্যে ব্যাংকিং হয়তো একটি। অথচ আমরা ব্যাংকাররা যে পেশায় আছি তাতে আমরা জানি না খালি হাতে কার টাকা কিংবা চেকটা ধরছি- তিনি রোগের বাহক কি না।

চারদিকে গ্রাহক পরিবেষ্টিত অবস্থায় বারবার বলার পরেও সামাজিক দূরত্ব মানতে অনেককেই বাধ্য করা যায় না। বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে আমাদের যেভাবে সেবা দিতে হয় তাতে কঠোর সামাজিক দূরত্ব কিংবা সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলো একরকম প্রহসন!

নিজেরা মাস্ক পরে ক্রমাগত গ্রাহকদের মাস্ক পরে দূরত্ব রক্ষা করে দাঁড়াতে বলার জন্য তাঁদের বিরাগভাজন তো হতে হয়ই, সেইসঙ্গে ক্রমাগত বলার পরে প্রাণশক্তি বলতে আর দিন শেষে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যাতায়াতের সীমাহীন কষ্ট।

সীমিত ব্যাংকিং সময়সূচি দেওয়া হলেও খুব কম জায়গাতেই সেটা মানা হচ্ছে। উপরন্তু যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক আভ্যন্তরীণ কর্মী সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে এবং সম্ভব হলে শুধু ব্রাঞ্চের নিকটবর্তী কর্মচারীদের দিয়ে কাজ চালাবার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেখানে তা মানা হচ্ছে কমই।

সিংহভাগ শাখা বা ব্যাংক কোনো আভ্যন্তরীণ কর্মী সমন্বয় না করেই সবাইকে অফিসে নেওয়া হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট সংখ্যক কর্মী থাকার পরেও। সবচেয়ে দুর্ভোগের সম্মুখীন নারী কর্মীরা, যাঁরা এক জেলা থেকে প্রতিদিন অন্য জেলায় গিয়ে অফিস করেন।

মাঝে কিছুদিন জেলার ভেতরে গণপরিবহন চললেও জেলার বাইরে যেতে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। তার ওপরে এই অতিমারি পরিস্থিতিতে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ব্যাংকিংসেবা দেওয়ার জন্য যাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

রোগ কিংবা এর ভয়াবহতা সবার জন্যই এক। কিন্তু ফ্রন্টলাইনার হিসেবে আমরা ব্যাংকাররা এই ঝুঁকির কতখানি ক্ষতিপূরণ পাচ্ছি? গত বছর দুই মাস প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। এ বছর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। আমরা এক একজন ব্যাংকার মানে আমরা একটি পরিবারেরও অংশ। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সেবা দিতে আমাদের আপত্তি নেই, কিন্তু আমাদের সুবাদে আমাদের পরিবারের ওপর চেপে বসা এই ঝুঁকি মোকাবিলায় কি আমরা ঝুঁকিভাতা আশা করতে পারি না?

পরিস্থিতিই এখন অস্বাভাবিক। আমাদের অবশ্যম্ভাবী কিছু বিষয়কে বাদ দিতে হতেই পারে। আর ব্যাংকের মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর যে সুযোগ তা অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় বেশি। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে ব্যাংকিং সম্ভব নয় এটা এ দেশের যে কোনো নাগরিক এক বাক্যে স্বীকার করবেন। তাই অন্তত শাখা রোটেশন ভিত্তিতে অথবা কর্মী রোটেশন ভিত্তিতে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালন এখন সময়ের দাবি।

জেলার বাইরে থেকে ব্যাংকারদের আনিয়ে রোগের প্রাদুর্ভাব না বাড়িয়ে ডেপুটেশনে কাজ চালানো যেতে পারে। লকডাউনকালীন ব্যাংকিং কার্যাদির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তরফ থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা সব ব্যাংক এবং শাখায় পরিপালন হচ্ছে কি না তা নিয়মিত নজরদারিতে রাখা এবং সর্বোপরি ঝুঁকিভাতার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

আমরা ফ্রন্টলাইনার এবং জরুরি সেবাদাতারা টিকতে পারলেই সেবার চাকা সচল থাকবে।

লেখক: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অসহায় ফ্রন্টলাইনার।

আরও দেখুন:
ব্যাংক খোলা নিয়ে তোঘলকি, করোনাজয়ী ব্যাংকাররাই!!!
করোনায় অর্থ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকার
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ: ১০ দিনে ৮ ব্যাংকারের মৃত্যু
আবারো দীর্ঘ হচ্ছে ব্যাংকারদের মৃত্যুর মিছিল
বিপন্ন ব্যাংকার, জীবন আগে

Leave a Reply