হোমবিবিধবিশেষ কলামইসলামী ব্যাংকের সফলতার মূলে বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ: মুনিরুল মওলা

ইসলামী ব্যাংকের সফলতার মূলে বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ: মুনিরুল মওলা

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং করলেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকেই সেবা দিয়ে যাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ৩৯ বছরে নানা ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও আমানত সংগ্রহ, বিনিয়োগ প্রদান ও রেমিট্যান্স আহরণে প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছে ব্যাংকটি। দীর্ঘ এই সময়ে শিল্প খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে দেশকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হতে সহযোগিতা করেছে, তেমনি কৃষি খাতে অর্থায়নের মধ্যে দিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি সড়ক, নৌপথ, এমনকি আকাশপথে যোগাযোগ স্থাপনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে দেশের পরিবহন খাতকে করেছে উন্নত।

👉 ইসলামী ব্যাংক এখন দেশের ব্যাংক খাতের মেরুদণ্ডঃ মুনিরুল মওলা

এভাবে ব্যক্তি খাতকে উৎসাহ জুগিয়ে দেশের পণ্য বিদেশে রপ্তানি বা বিদেশ থেকে দেশে পণ্য এনে বিক্রির জন্য অর্থায়ন করেছে ব্যাংকটি। বর্তমানে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বে আছেন মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা। গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গ্রাহকসেবা আরও সহজ ও দ্রুততর করতে ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবায় জোর দিচ্ছেন তারা। তাছাড়া ব্যাংকের বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত, রিটেইল ব্যাংকিং, কৃষি ও ভোক্তাঋণে জোর দিচ্ছেন তারা।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ মুনিরুল মওলা বলেন, ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ রাজধানীর মতিঝিলে ছোট পরিসরে চালু হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংক। এর মধ্যে ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নে টেকসই ব্যাংকের শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ১০ শতাংশই ইসলামী ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে। পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। আমানত সংগ্রহের বিষয়ে ব্যাংকটির এমডি বলেন, ‘আমাদের বেশিরভাগ আমানতই এসেছে ছোট ছোট সঞ্চয় থেকে।

করপোরেট আমানত খুবই নগণ্য। যার ফলে আমাদের আমানত খুবই স্থিতিশীল। এখনো আমরা ১০০ টাকা জমা রেখে আমানত হিসাব খুলি। আমরা ১০ টাকায় আমানত খুলতে শুরু করি ১৯৯৫ থেকে। শিক্ষার্থীদের হিসাব খোলার সুবিধাও দিচ্ছি আমরা। আমরা ১০০ টাকা দিয়েও মাসিক আমানত স্কিম খোলার সুযোগ দিচ্ছি। এর ফলে আমাদের দেখাদেখি ১০টি ব্যাংক পূর্ণাঙ্গভাবে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং করছে।’

👉 চল্লিশ বছরের ইসলামী ব্যাংকঃ শীর্ষে উঠার পিছনের কথা

সারা দেশে ১০০০ রাইস মিলে বিনিয়োগ করেছে ইসলামী ব্যাংক। পরিবহন খাতে ১ লাখ নিবন্ধিত গাড়ি ও ৫০০টি নৌযানে বিনিয়োগ রয়েছে ব্যাংকটির। এছাড়া ৫টি উড়োজাহাজেও বিনিয়োগ করেছে শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকটি। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। যা ব্যাংক খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ।

এ বিষয়ে মুনিরুল মওলা বলেন, ‘আমরা রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিমের (আরডিএস) মাধ্যমে যেমন রিকশাওয়ালাকে অর্থায়ন করছি, তেমনি শ্যামলী পরিবহন, গ্রিনলাইন, হানিফ পরিবহন, সৌদিয়া, এসআলম পরিবহনের মতো বড় বড় পরিবহন প্রতিষ্ঠানে আমরা বিনিয়োগ করেছি। আবাসন খাতেও আমাদের মোট বিনিয়োগের ১০ শতাংশের মতো বিনিয়োগ রয়েছে। ’

👉 সেলফিন অ্যাপে পাওয়া যাবে ইসলামী ব্যাংকের সব সেবা

২০২১ সালে ইসলামী ব্যাংক ৫১ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আনতে সক্ষম হয়। যা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘২০১৯ সাল পর্যন্ত রেমিট্যান্স স্বাভাবিক গতিতে বাড়ছিল। করোনার মধ্যে এ খাতে যে প্রবৃদ্ধি হয় তা অস্বাভাবিক ছিল। এখন আবার সেই রেমিট্যান্স আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরেছে। সামনে রোজা ও কোরবানির ঈদ আছে- এই সময়ে রেমিট্যান্স আবারও বাড়বে বলে আশা করা যায়। ’

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হলেও দেশের সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে সেবা দিচ্ছেন উল্লেখ করে মুনিরুল মওলা বলেন, ‘আমাদের মোট আমানতের ১০ শতাংশ গ্রাহকই নন-মুসলিম। আমরা আদিবাসীদেরও অর্থায়ন করছি। সাঁওতাল পল্লীতেও আমাদের বিনিয়োগ রয়েছে।’

👉 সফলতার সাথে ইসলামী ব্যাংকের চল্লিশ বছর

সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্য থেকেই বিনিয়োগ করছেন উল্লেখ করে ইসলামী ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘আমাদের ব্যালান্সশিট সবার জন্য উন্মুক্ত। এখানে গোপন করার মতো কোনো বিষয় নেই। শতভাগ স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে আমরা সবকিছু করি। দূর থেকে অনেকে অনেক কথা বলেন। এটাও আমাদের ব্যর্থতা, আমরা হয়তো তাদের কাছে আমাদের স্বচ্ছতার কথা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারিনি। ’

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ সালে আমদানি বাণিজ্য করেছে যথাক্রমে ৬৪ হাজার কোটি টাকা ও রপ্তানি বাণিজ্য করেছে ৩৪ হাজার কোটি টাকা। আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের মার্কেট শেয়ার যথাক্রমে ১১.৪ শতাংশ ও ৮ শতাংশ।

বৈদেশিক বাণিজ্যের পাশাপাশি দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রিটেইল ব্যাংকিং, কৃষি ও ভোক্তা ঋণের জোর দেওয়ার কথা বলছেন ইসলামী ব্যাংকের এমডি মুনিরুল মওলা। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমরা করোনায় গ্রামে ফিরে যাওয়া ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করব। তারা তো জানে কীভাবে ব্যবসা করতে হয়। কিন্তু গ্রামে হয়তো তারা সুবিধা করতে পারছে না। আমরা যদি তাদের অর্থায়ন করি তারা হয়তো গ্রামে বসেই নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে। ’

খেলাপি সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মুনিরুল মওলা বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক এক্ষেত্রে খুবই ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে খেলাপিদের প্রশ্রয় দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। খেলাপিরা আদালতের স্টে অর্ডার নিয়ে খেলাপিমুক্ত থাকার যে চেষ্টা চালাচ্ছে সেটাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। তাহলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতের এই সমস্যাটি দূর হবে। ’

নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে ব্যাংকটি। ইসলামী ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টার্ট-আপ ফান্ড নিয়ে কাজ করছি। কারণ, একশটি স্টার্ট-আপের মধ্যে ৫টি সফল হয় আর তার মধ্যে দুই-একটি হয় বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান। এটা হলেও তা অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরনের উন্নয়ন ঘটতে পারে। আমরা এখনো স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোনো বিনিয়োগ প্রস্তাব পাইনি। ’

দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগে জোর দেওয়ার দরকার রয়েছে উল্লেখ করে ইসলামী ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে সিন্ডিকেশন করে ঋণ দেওয়া ভালো। আমরা মনে করি, টেকসই ব্যাংকিংয়ের জন্য এসএমই, রিটেইল, কৃষি ও ভোক্তাঋণের ওপর জোর দেওয়া দরকার।’

এ সম্পর্কিত আরও দেখুন

Leave a Reply

এ সপ্তাহের জনপ্রিয় পোস্ট

সর্বশেষ পোস্ট