খেলাপি ঋণ ও সুদের হার

0

ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি না হওয়ার জন্য সুদহার যতোটা না দায়ী তারচেয়ে বেশি দায়ী ঋণ গ্রহীতার মানসিকতা। সুদহার যখন দুই অংকের ছিলো তখন ব্যাংক ঋণ ও আদায় যে হারে ছিলো, এক অংক হওয়ার পরে এই পরিসংখ্যান আরো খারাপ হচ্ছে বা হবে। এর কারণ গুলো একটু দেখার চেষ্টা করি।

করোনা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে যতোটা না পিছিয়ে দিবে তারচেয়ে বেশি পিছিয়ে দিবে করোনাকে উপলক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করে এক শ্রেণীর ঋণ গ্রহীতার ঋণ ফেরত না দেয়ার ইচ্ছেকৃত (willful) মানসিকতা। করোনার এই মহা দুর্যোগের মধ্যে ও অভ্যন্তরীণ ভোগ নিশ্চিত ভাবে কমেছে, কিন্তু এই ভোগ কমে যাওয়ার হার কতো। সব পরিসংখ্যান থেকে ডাঁটা নিয়ে বলতে পারি ভোগ কমেছে ৫৪ শতাংশ। কিন্তু ব্যাংক ঋণ ফেরত না দেয়ার হার প্রায় ১০০ শতাংশ। তাহলে এই সংখ্যাগত পার্থক্য কেন? ব্যাংকে টাকা ফেরত আসছে না কেন।

ব্যাংকে টাকা ফেরত না আসার মূল কারণ হলো পলিসির ক্রমাগত পরিবর্তন যা ঋণ গ্রহীতার কাছে একটি বার্তা দিয়ে যাচ্ছে এই ভাবে- ‘দেখিনা আর কি হয়, আরো কিছু দিন পর সরকার হয় তো পুরো ব্যাংক ঋণের সুদই মাফ করে দিবেন, এরপর হয়তো মূল টাকার কিছু অংশ মাফ করতে পারে। একসময় হয়তো পুরো টাকাটা ই মাফ হয়ে যেতে পারে!’ এই মানসিকতা এক শ্রেণীর ঋণ গ্রহীতার মধ্যে পাকাপোক্ত হচ্ছে এটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। ইতিমধ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে ব্যাংক হচ্ছে সবচেয়ে ভদ্র পাওনাদার। একজন ঋণ গ্রহীতার মতে, ‘ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সুবিধা হলো-সময় মতো ফেরত না দিলে কিছুই হয় না। কিন্তু ব্যক্তি বা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিলে সময় মতো ফেরত দিতেই হবে, নইলে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ভাবে হেনস্থা হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। আর ব্যাংক ঋণের আরেকটা সুবিধা হলো ফেরত না দিলে মাঝে মাঝে কিছু রুটিন ফোন কল আসে, অথবা মাঝে মাঝে ব্যাংক ম্যানেজার অফিসে বা বাসায় চা খেতে আসে, অথবা পুনঃতফসিলের মতো দীর্ঘ প্রক্রিয়া যা ঋণ গ্রহীতাকে সর্বসাকুল্যে ছয় বছর সময় দেয় ঋণ ফেরত দিতে। আর মামলা হলে তো কথাই নাই। মামলা হওয়া মানেই ব্যাংক ঋণের উপর ব্যাংকারদের অধিকারহীনতা।’ এই যদি হয় ঋণ গ্রহীতার মানসিকতা তাহলে ব্যাংক ব্যবস্থা টিকবে কীভাবে।

ব্যাংকিং একটা ব্যবসা। কিন্তু এটা এমন এক অদ্ভুত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা হয়ে গেছে যেখানে কেনা ও বেচার দাম নির্ধারিত। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সম্ভবত পৃথিবীর কোন ব্যবসা- তা পণ্য ই হোক বা সেবাই হোক-এমন দাম নির্ধারণী ও নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় নেই। শুধু জনস্বার্থে সরকার ভর্তুকি দিয়ে নাগরিকের জন্য পণ্য ও সেবার ব্যবস্থাপনা করার মতো হয়ে গেছে এই দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা যা এক শ্রেণীর ঋণ গ্রহীতার মধ্যে এক ধরনের না-বোধক বার্তা দিয়ে যাচ্ছে।

দিন দিন ব্যাংকিং পেশাকে ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের প্রতিপক্ষ করে তোলা হচ্ছে, মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহোদয় কে বোঝানো হচ্ছে- ‘ব্যাংক হলো একটি অর্থনৈতিক নির্যাতক প্রতিষ্ঠান যারা অনেক সুদ নেয়, এদের এমন অমানবিক সুদারোপের কারণে আমরা ব্যবসা করতে পারছিনা, দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না, আমরা টাকা ফেরত দিতে পারছি না, অতিরিক্ত সুদের কারণে ঋণ খেলাপির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি।’ ভাবখানা এমন ঋণের সুদ কমলেই রাতারাতি শ্রেণীকৃত ঋণ ফেরত আসবে এবং ব্যাংক ব্যবসা যৌবন ফিরে পাবে। কিন্তু এই দেশ থেকে বিদেশে মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা চলে গেছে সে টাকা যে ঋণের টাকা যার জন্য ব্যাংকের প্রায় তিন শতাংশ অতিরিক্ত খরচ বেড়ে গেছে তা একমাত্র ব্যাংকের কর্মচারী আর সুশীল শ্রেণী ছাড়া আর কেউ বলছি না। এর কারণ হলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সবাই এই ‘অর্থ ফেরত না দেয়া’ ও ‘বিদেশে পাচারকৃত’ অর্থের সুবিধাভোগী। যারা মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে ভুল বোঝাচ্ছেন, খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে তারাই মূলত ব্যাংকের আজকের এই উচ্চ সুদ ও উচ্চ মাত্রার ব্যয়ের জন্য দায়ী।

অন্যদিকে ব্যাংকের এক শ্রেণীর মালিক পক্ষের মাথাব্যাথা না থাকার কারণ হলো, ওই শ্রেণীর মালিক হয় ঋণ খেলাপি নয়তো অর্থ পাচারকারী । তাই এই দাম-নির্ধরিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা তাদের জন্য পোয়াবারো হয়ে গেছে। তারা নিজেদের ব্যাংক ব্যবসায় যতটুকু কম আয় করবেন ততটুকু পুষিয়ে নিতে পারবেন অন্য ব্যাংকে থাকা নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঋণ হিসাব থেকে যা নির্ধারিত হয়ে আছে নয় শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে তাদের হাতে জমে উঠা অলস টাকা দিয়ে ব্যাংকের সাথে উচ্চ সুদের আমানতের জন্য দরকষাকষি করছেন, নয়তো বিদেশে অর্থ পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দুই মাসের স্থগিত সুদ নিয়ে কোন মালিকই উচ্চবাচ্য করেনি। কারণ এই ধরনের সিদ্ধান্তে তারাও সুবিধাভোগী। ক্ষতি শুধু ব্যাংকের কর্মচারীদের ও জনগণের। এই পদ্ধতির ব্যাংকিং চলতে থাকলে সম্পদের কেন্দ্রীকরণ (Centralization of wealth) বৃদ্ধি পাবে, ধনীর কাছে আরো ধন পুঞ্জীভূত হবে। অপরদিকে ব্যাংকের আয় কমবে, জনসম্পদ বেকার হবে। দেশের চেয়ে বিদেশে বাংলাদেশী মালিকানায় এক বিশাল অর্থনীতি রয়েছে যা ইতিমধ্যে মাননীয় অর্থমন্ত্রী বুঝতে পেরেছেন বলে অর্থ পাচারের শাস্তি হিসেবে পাচারকৃত অর্থের উপর পঞ্চাশ শতাংশ জরিমানা আরোপের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো অর্থ পাচার ঠেকাবে কে? ব্যাংকিং চ্যানেলে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে থাকে তার চেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়ে থাকে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে।

সবার জন্য সমহারে ঋণের সুদ কোনো ভাবেই কাম্য হতে পারে না। এখানে একটি গুণগত বিশ্লেষণ (Qualitative Judgment) প্রয়োজন। যেসব ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃত খেলাপি, ঋণের টাকা ফেরত না দেয়ার জন্য বিভিন্ন রকম ওজর আপত্তি দাঁড় করায় তাদের জন্য ঋণের সুদ নির্ধারিত হবে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্ক ও গ্রাহকের পূর্বের ঋণ আচরণের উপর ভিত্তি করে। আর যারা খেলাপি হয়েছে বিভিন্ন ধরনের মাইক্রো ও ম্যাক্রো অর্থনৈতিক উপাদানগুলো দ্বারা আক্রান্ত হয়ে। এইসব প্রকৃত ঋণগ্রহীতাদের জন্য ব্যাংক প্রয়োজনে দুর্যোগে কস্ট প্রাইসে ঋণ দিবে। পরিস্থিতির উত্তরণ হলে ঋণ গ্রহীতাকে ও দুর্দিনে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়ার পুরস্কার স্বরূপ ব্যাংকের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে হবে । অর্থাৎ ব্যবসা হবে সমান সমান বা win-win. ঋণের সুদের হার নয় শতাংশ বেঁধে দেয়ার আগে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন ছিলো তা হলো, অর্থবাজারের কাঠামো। এই কাঠামোর মধ্যে পড়ে খেলাপি ঋণ, অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, অনানুষ্ঠানিক অর্থ বাজার, অর্থ ফেরত না দেয়ার মানসিকতা ও সংশ্লিষ্ট আইনের ধীর গতি। এগুলোর কোনটাই বিবেচনা না করে রাতারাতি যে সিদ্ধান্ত হয়েছে একজন মাঠ পর্যায়ের কর্মী হিসেবে এর সুদূরপ্রসারী পরিণতি কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

খেলাপি ঋণের ব্যাপারে কোন ফয়সালা না করে ৯ শতাংশ সুদের হার বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব না। এই জন্য গণিত বিশারদ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। খেলাপি ঋণের জন্য ব্যাংক যে ঘানি টানছে তার জন্য ঋণের RRI (Real Rate of Interest) কমপক্ষে ২ শতাংশ কমে যাচ্ছে, অর্থাৎ ঋণের প্রকৃত সুদ ৭ শতাংশ। এই অবস্থায় সামনের দিনগুলোতে কী হবে আল্লাহ্ ভালো জানেন।

অথচ কেউ বিষয়টি নিয়ে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে যাচ্ছে বলে মনে হয় না। শুধু একপাক্ষিক আলোচনা শুনেই আমার মনে হয় ব্যাংক নিয়ে সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছে। এতে কোনো চিন্তন, পরিসংখ্যান কাজ করছে বলে মনে হয় না। জোর করে চাপিয়ে দিলে অর্থনীতির চাকা উল্টো ঘুরতে শুরু করে যার প্রমাণ আমরা এক এগারোর সময় পেয়েছি। অর্থনীতি একটি সামাজিক বিজ্ঞান। সমাজের অন্যান্য organ গুলো ঠিক না করে শুধু pain killer দিয়ে ব্যথা সারানোর আপাতত প্রচেষ্টা হয়তো ডাক্তারকে বাহবা পেতে সহায়তা করবে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। পরিণামে কিডনি Failure সহ অন্যান্য অসংখ্য রোগ মাথা ছাড়া দিয়ে উঠবে।

কার্টেসি: মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ব্যাংকার।

Leave a Reply