করোনায় আক্রান্ত অনেক ব্যাংকার, তবুও থেমে নেই গ্রাহক সেবা!

0

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ৮ মার্চ করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়তে থাকে। পরিস্থিতির সামাল দিতে বাংলাদেশ সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে দফায় দফায় বাড়াতে থাকে। বেশির ভাগ পেশার মানুষ ঘরে বসে বিনোদনে অলস সময় পার করছে ঠিক তখনি ডাক্তার, পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে অর্থনীতির চাকা সচল ও সাধারণ মানুষের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে ডাক্তার পুলিশের মতো ব্যাংককারেরাও সক্রিয়ভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অফিস করছেন প্রতিদিন। ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংককের বহু সংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এমন কি তাঁদের সাথে তাদের পরিবারের সদস্যরাও সংক্রামিত হয়েছেন। পু্লিশ সদস্যদের মতো ব্যাংককারদের সংক্রামনের হার বেশি হওয়ার কারণ জানালেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডাক্তার কাসেম।

তিনি বলেন, ব্যাংককে বিভিন্ন পেশার মানুষ অর্থিক লেনদেন করার জন্য প্রবেশ করে। যেমন, কাপড় ব্যবসায়ী, বিভিন্ন হোল সেল ব্যবসায়ী, খুচরা ব্যবসায়ী, মাছ ব্যবসায়ী ও সবজি ব্যবসায়ী সহ নিম্ম আয়ের অনেক মানুষ। যারা স্বাস্থ্য বিধি মেনে ব্যবসা করেন না। শুধু তাই নয় ইউরোপ-আমেরিকা ফেরত কিংবা তাদের সংস্পর্শে থাকা পরিবার পরিজন ও ব্যাংককে আসেন অর্থিক লেনদেন মেটাতে। এসব কারণে ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।

কয়েকটি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ঘুরে দেখা যায় মানুষ প্রয়োজনে ব্যাংককে আসে। ব্যাংক বন্ধ থাকলে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ ঠিক থাকবে না।

১৪ মে আল আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জের গাউছিয়া শাখার গেইটে ৩.৪৫ মিনিটে কাজী রাইস এজেন্সীর মালিক ব্যাগ ভর্তি টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় এখন রমজান ব্যাংক টাইম ২.৩০ পর্যন্ত, আপনি এত দেরি করলেন? তিনি বললেন, নওগাঁয় চাউলের টাকা না পাঠালে অত্র এলাকায় চাউলের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিবে, তাছাড়া খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করতে দেরি হয়েছে। ভিতরে ঢুকে দেখা গেল মুখে মাস্ক হাতে গ্লাবস ও পিপিই পরিহিত ক্যাশ অফিসার সাজ্জাদ হোসেন (নায়েম সাজ্জাদ) টাকা জমা নিচ্ছেন। তাকে প্রশ্ন করলাম, এখন চারটার কাছাকাছি সময় আপনাদের লেনদেন শেষ হবে কখন? তিনি বলেন, এখানে চাউল ব্যবসায়ী, ফলের আড়ৎ, সবজি, মাছের আড়তসহ নিত্য পণ্যের টাকা দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়। এছাড়া অনেক রেমিট্যান্সের টাকা আসে। বাজার স্বাভাবিক ও মানুষের কথা চিন্তা করে হাসিমুখে সব কষ্ট মেনে নিই।দেশের মানুষের জন্য কাজ করছি এটা মনে হলে সব কষ্ট ভুলে যাই।

সোনালী ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার পদে কাজ করেন আসাদুজ্জমান তমাল। তিনি বলেন, বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালে রনাঙ্গনে সম্মুখ সমরে লড়াই করেছিলেন। বাবা আমাকে বলেন ডাক্তার, পুলিশ ও তোমারা ব্যাংককারেরা এই সময়কার মুক্তিযোদ্ধা। কারণ অনেক ঝুকি নিয়ে তোমরা দেশের ক্রান্তিলগ্নে কাজ করছো।

আমাদের আরেক প্রতিবেদক ঢুকলেন অগ্রণী ব্যাংক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখায়। সেখানে কথা হয় ক্যাশ অফিসার আতিকুর রহমান (আতিক আলতাফ) এর সাথে। তিনি বলেন, অফিস টাইম শেষ হতে কয়েক মিনিট মাত্র বাকী। অথচ এখন টাকা পাঠাতে না পারলে (সামনে দাড়ানো ব্যাক্তি) ওনার পণ্যবাহী ট্রাক আটকে যাবে। আর আজকে পণ্য না আসা মানে বাড়তি লসের বোঝা, সামনের দুই দিন যে ছুটি! ভিড়ের মধ্যেও নির্দিষ্ট সময়েই আমরা সব ব্যবস্থা করে দিলাম। অতঃপর সেই হাসি। এইসব হাসিমাখা মুখ আমাদের কাজের নজরানা।করোনার কালে আমাদের উদ্যম বাড়ে তাতে।

একজন ভদ্রমহিলা এলেন ফরেন রেমিট্যান্স নিতে। অন্য জায়গায় নাকি দুই দিন ঘুরেও কোন কূলকিনারা করতে পারেননি। ওনার চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ। আল আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা জাহেদ হাসান নোবেল তাকে শান্ত হয়ে বসতে বললেন। মিনিট চারেক পর যখন প্রিন্টার থেকে সশব্দে ওনার ভাউচার বেরোচ্ছিল, আড় চোখে চেয়ে দেখি ওনার চেহারায় প্রশান্তির ঝিলিক। এরপর তিনি যা করলেন সেটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না মোটে। কোথায় যেন ফোন করে বললেন, ব্যাংককের স্যারেরা অনেক ভাল, কোন হয়রানি ছাড়া রেমিট্যান্সের টাকা সহজে দিয়ে দিলেন।

ব্যাংক কর্মকর্তা জাহেদ হাসান নোবেল এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, করোনার দিনগুলোতে জরুরি আর্থিক সেবা নিয়ে মানুষের কাজে লাগতে পেরে আমরা গর্বিত ব্যাংকার! -সংগৃহীত।

Leave a Reply