করপোরেট ঋণেই বড় ঝুঁকি ইস্টার্ন ব্যাংকের

0

নানা সংকট-সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের বেশির ভাগ ব্যাংক। মৌলিক কিছু সূচকে ভালো অবস্থানে আছে হাতে গোনা কয়েকটি ব্যাংক। দেশী-বিদেশীদের সুদৃষ্টিতে থাকা এ ব্যাংকগুলো কেমন আছে, তা নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিকের শেষ পর্ব আজ।

দেশের বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগের ওপর ভর করেই বেড়ে উঠেছে ইস্টার্ন ব্যাংক। করপোরেট ব্যাংকিং জগতে বেশ সুনামও কুড়িয়েছে ব্যাংকটি। দেশের শীর্ষ করপোরেটদের অনেকেই ইস্টার্ন ব্যাংকের গ্রাহক। প্রতিষ্ঠানটির ভালো ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতির পেছনেও বড় অবদান রয়েছে করপোরেট ব্যাংকিংয়ের। যদিও বেড়ে ওঠার সিঁড়ি করপোরেট ঋণই বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে ব্যাংকটির জন্য। করোনাভাইরাসের কারণে ইস্টার্ন ব্যাংকের অনেক বড় গ্রাহকের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় ঋণ পরিশোধ নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন ব্যাংকটির গ্রাহকরা।

দেশে হাতে গোনা যে কয়েকটি ব্যাংকের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মুডিসের ক্রেডিট রেটিং আছে, ইস্টার্ন ব্যাংক তার মধ্যে একটি। ২০১৬ থেকে টানা তিন বছর ‘বিএ৩’ রেটিং পেয়েছে ব্যাংকটি। কিন্তু সম্প্রতি মুডি’স ইস্টার্ন ব্যাংকের রেটিং ধাপ নামিয়ে বি২ করেছে। মুডি’স কোনো ব্যাংককে বি২ রেটিং দেয়ার মানেই হচ্ছে ব্যাংকটির সম্পদ উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়।

এছাড়া দেশী-বিদেশী মুদ্রায় ইস্টার্ন ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি ডিপোজিট রেটিং ‘বি-১’ করেছে মুডি’স। সেই সঙ্গে ব্যাংকটির রেটিং পূর্বাভাস স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচক করেছে ঋণমান সংস্থাটি। করপোরেট ব্যাংকিংয়ে ইস্টার্ন ব্যাংকের অতিমাত্রায় নির্ভরতাকে ঝুঁকি হিসেবে দেখছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান এটি ক্যাপিটালও। প্রতিষ্ঠানটির দৃষ্টিতে ব্যাংকটির ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৭০ শতাংশই করপোরেট খাতের, যা কভিড পরিস্থিতিতে ব্যাংকটিকে বড় রকমের চাপের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

মুডিসের নেতিবাচক বার্তা প্রসঙ্গে ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী রেজা ইফতেখার বণিক বার্তাকে বলেন, মুডি’স তাদের পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। এ পর্যবেক্ষণ আমরা নোট হিসেবে নিয়েছি। করোনাসৃষ্ট দুর্যোগ থেকে ইস্টার্ন ব্যাংকের গ্রাহকদের সুরক্ষা দিতে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য সরকার ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ ছাড় দেয়া হয়েছে। এসএমই খাতের প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়নও সন্তোষজনক। আশা করছি, আমাদের গ্রাহকরা করোনাসৃষ্ট চাপ কাটিয়ে উঠবেন।

২০১৯ সাল শেষে ইস্টার্ন ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। এ ঋণের মধ্যে ১৬ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকাই বিতরণ করা হয়েছে করপোরেট খাতে, যা ব্যাংকটির পোর্টফোলিওর ৬৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। শুধু ২৪টি করপোরেট গ্রুপের কাছেই ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণ রয়েছে ১০ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা।

তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ট্রেডিং, স্টিল, নির্মাণ, সিমেন্ট খাতে বড় বিনিয়োগ রয়েছে ব্যাংকটির। ব্যাংকঋণকে ঝুঁকিতে ফেলা জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙা শিল্পেও বড় বিনিয়োগ আছে ইস্টার্ন ব্যাংকের। আগে থেকেই ইস্টার্ন ব্যাংকের ট্রেডিং, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা এবং বস্ত্র খাতের ঋণের একটি অংশ ঝুঁকিতে ছিল। বিশ্বব্যাপী তাণ্ডব চালানো করোনা মহামারী ব্যাংকটির ঋণঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইস্টার্ন ব্যাংকের প্রায় ৪০০ বড় গ্রাহকের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ও ঋণের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, করোনার আগে থেকেই অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা খারাপ যাচ্ছিল। করোনা এসে তাদের ব্যবসা আরো নাজুক করে দিয়েছে। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে এসব গ্রাহকের ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধও।

দেশে হঠাৎ করেই বড় সম্প্রসারণের পর বড় পতন হয়েছে এমন ভারী শিল্পগুলোর একটি জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা খাত। ২০০৮-পরবর্তী সময়ে এ খাতে আগ্রাসী বিনিয়োগ করে বিপদে পড়েছে অনেক ব্যাংক। এ তালিকায় সামনের সারিতেই রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংকের নাম। জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা খাতে বিতরণকৃত ঋণের বড় অংশ খেলাপি হওয়ায় বারবার তা পুনঃতফসিল করেছে ব্যাংকটি। তার পরও খেলাপি হওয়ায় বেশকিছু ঋণ অবলোপন করতে হয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংককে। ২০১৯ সাল শেষে এ খাতে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ ছিল ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০৬ কোটি টাকাই ছিল খেলাপির খাতায়।

জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা খাতে ইস্টার্ন ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সাগরিকা শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রি, আর এ শিপ ব্রেকিং, সিটিজি শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি, ওশান ইস্পাত, জনতা স্টিল লিমিটেড, চট্টগ্রাম স্টিল এন্টারপ্রাইজ। রাইজিং স্টিল লিমিটেড, রহমান শিপ ব্রেকিং, মাবিয়া শিপ ব্রেকিং, ম্যাপস স্টিল ব্রেকিং, শীতলপুর স্টিল মিলস, মোস্তফা স্টিল গ্যালভানাইজিং প্লান্ট, এস আর এস শিপ ব্রেকিংয়েও বড় অংকের বিনিয়োগ আছে ব্যাংকটির। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগের অবস্থাই বর্তমানে নাজুক। অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ। ওশান ইস্পাতের কার্যক্রম চালু থাকলেও আগের মতো ব্যবসায়িক জৌলুশ নেই প্রতিষ্ঠানটির।

জাহাজ ভাঙা খাতে ইস্টার্ন ব্যাংকের অন্যতম বড় গ্রাহক চট্টগ্রামের রাইজিং গ্রুপ। মামলা ও ঋণের ভারে প্রায় দেউলিয়া হওয়া এ গ্রুপের কর্ণধার হলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকায় তার বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই বন্ধ। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে রহমান শিপ ব্রেকিংও।

চট্টগ্রামের একসময়ের অন্যতম শীর্ষ শিল্প গ্রুপ মোস্তফার বড় ঋণ রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংকে। এ ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেয়া মোস্তফা স্টিল গ্যালভানাইজিং প্লান্ট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। মোস্তফা গ্রুপের অংশীদার হেফাজতুর রহমান ও তার পরিবারের আরো কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলায় আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। অন্যদিকে ইস্টার্ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ না করে অস্ট্রেলিয়া পালিয়েছেন ম্যাফ ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার মাকসুদুল আলম।

ইস্টার্ন ব্যাংকের বড় গ্রাহকদের তালিকায় রয়েছে জুতা রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান বে ফুটওয়্যার লিমিটেড। শতভাগ রফতানিমুখী জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি বড় ধাক্কা খেয়েছে করোনা মহামারীর কারণে। রফতানি কমে যাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশও ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা।

বে ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের ব্যবসা বেশ ভালোই চলছিল। তবে কভিডের কারণে গত দুই ঈদে খুচরা বাজারে বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণে গড়ে তোলা আমাদের প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রফতানিমুখী। এ কারখানার ক্রয়াদেশ ২৫-৩০ শতাংশের মতো কমেছে। ইউরোপ-আমেরিকায় দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করা গেলে আগামী মৌসুমে ক্রয়াদেশ ফিরতে পারে। তবে রফতানি যদি কমে যায় তাহলে ব্যাংকঋণ পরিশোধ ব্যাহত হবে। এটা আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। প্রত্যাশা করছি রফতানি কমবে না। কভিডের দ্বিতীয় ঢেউ যদি মারাত্মক না হয় তাহলে সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারব বলে আশা করছি।

বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতেও বড় বিনিয়োগ আছে ইস্টার্ন ব্যাংকের। ব্যাংকটি থেকে শতকোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে এ খাতের এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে আশিক কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড স্টিচেস লিমিটেড, ইউনিকম টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, ইমপ্রেস-নিউটেক্স কম্পোজিট টেক্সটাইলস লিমিটেড, গ্রাফিকস টেক্সটাইল লিমিটেড, অর্কিড সোয়েটার লিমিটেড, এস এম নিটওয়্যারস লিমিটেড, অনন্ত ডেনিম টেকনোলজি লিমিটেড, ইপিলিয়ন স্টাইল লিমিটেড, কামাল ইয়ার্ন লিমিটেড, ভিয়েলাটেক্স স্পিনিং লিমিটেড, সালেক টেক্সটাইল লিমিটেড, ক্রোনি অ্যাপারেলস লিমিটেড এবং এটিএস অ্যাপারেলস লিমিটেড। ইউরোপে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় ব্যবসা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের এসব প্রতিষ্ঠান।

ইস্টার্ন ব্যাংকের অন্যতম বড় গ্রাহক স্ট্যান্ডার্ড স্টিচেস লিমিটেড। দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রফতানিকারক স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের এ প্রতিষ্ঠান মূলত ওভেন পোশাক প্রস্তুত ও রফতানি করে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ক্রেতানির্ভর প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে কভিড-১৯ মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ সূত্র জানিয়েছে, ক্রয়াদেশ সংকটে ভুগছে কারখানাটি। স্বাভাবিক সময়ে ন্যূনতম ১০ ঘণ্টা কারখানা চললেও বর্তমানে ক্রয়াদেশ সংকটে ৭ ঘণ্টার বেশি উৎপাদন সচল রাখতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।

পোশাক শিল্প মালিক সংগঠন বিজিএমইএ সূত্র বলছে, শুধু স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ নয়, পুরো পোশাক খাতেই রফতানিমুখী কারখানাগুলোর ক্রয়াদেশ এখনো কভিড-পূর্ব স্বাভাবিক গতিতে ফেরেনি। ফলে উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। ক্ষেত্রবিশেষে উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ৭০-৭৫ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। পোশাক শিল্প মালিকরা অধীর আগ্রহে কভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

একই অবস্থা বিরাজ করছে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল সুতা ও কাপড়ের উৎপাদক বস্ত্র শিল্পে। বস্ত্র খাতের শিল্প মালিক সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সূত্র বলছে, সংগঠনের সদস্য স্থানীয় বাজারনির্ভর মিলগুলো এখন সমস্যা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। রফতানিমুখী শিল্পগুলো বড় ধরনের ব্যবসা করতে পারছে না। স্বল্প ক্রয়াদেশ নিয়ে এখন কোনো রকমে কারখানা সচল রাখছেন উদ্যোক্তারা।

দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়ে ব্যাংকিং খাতেও। এতে করপোরেট ঋণনির্ভর ইস্টার্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বাড়বে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে মুডি’স। এ প্রসঙ্গে ইস্টার্ন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী আলী রেজা ইফতেখার বলেন, দেশের প্রতিটি ব্যাংকই নিজস্ব নীতিতে সম্প্রসারিত হয়। ইস্টার্ন ব্যাংক করপোরেট খাতকে গুরুত্ব দিয়ে সম্প্রসারিত হয়েছে। যেমনটা এসএমই খাতকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে ব্র্যাক ব্যাংক। করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা থেকে আমরা আমাদের গ্রাহকদের সুরক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বনিক বার্তা।

Leave a Reply