করোনাভাইরাস: ব্যাংকার কতটা সুরক্ষিত?

0

ছুটি বলা হলেও মূলত করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সারা দেশে বেড়েছে লকডাউনের সময়সীমা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এখন কমিউনিটির ভেতরে বিভিন্ন ক্লাস্টার বা পুঞ্জ থেকে করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছে। সাধারণ মানুষ ঘরে না থাকলে কিংবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করতে না পারলে এটি মহামারীতে রূপ নিবে।

করোনাভাইরাসের কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশজুড়ে শুরু হওয়া ‘লকডাউনে’ কর্ম হারিয়ে আয়হীন হয়ে পড়ছেন অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রায় ৫ কোটি মানুষ। সাধারণ খেটে খাওয়া থেকে শুরু করে নির্মাণ শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন খাতে জড়িত এসব মানুষ কার্যত আয়হীন হয়ে পড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে যারা ত্রাণ বা সহায়তা পাচ্ছে, তাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হলেও, যারা কোনো সহায়তা পাচ্ছে না, তাদের তিন বেলা খাবার জোগানো প্রায় অসম্ভব। তাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর শঙ্কার মধ্যেই দেশের অর্থনীতি পড়েছে বড় ধরনের ঝুঁকিতে।

কিছুদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোতে সাধারণ অ্যাকাউন্টধারীদের সঞ্চয়ের পরিমাণের একটি হিসাব তুলে ধরা হয়। সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সারাদেশে ৭ কোটি ৫২ লাখ ৯৪ হাজার ৪৫১টি অ্যাকাউন্টে জমা আছে ৫ হাজার টাকারও কম। অন্য কোথাও জমানো টাকা না থাকলে বা আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হলে ওই পরিবারগুলো এক সপ্তাহের চাল-ডালও কিনতে পারবেন না তারা। এমনকি করোনাভাইরাস বা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত হলে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে দূরের কোনো হাসপাতালে যাওয়া কিংবা বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে গিয়ে ডাক্তার দেখানোর খরচ মেটানোও তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। প্রতিটি অ্যাকাউন্টে গড়ে টাকা রয়েছে মাত্র ৬১০। যা দিয়ে চার সদস্যের পরিবারের সাত দিনের চাল, ডাল, তেল, লবণসহ অতি জরুরি খাদ্যপণ্য কেনাও সম্ভব নয়।

আবার ব্যাংকে অ্যাকউন্টধারীদের একটি বড় অংশ ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমান বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক ছিল ১৫ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৮ জন। বিশেষ করে শহর অঞ্চলে কার্ডধারীর সংখ্যা বেশি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যারা দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করছে কার্ডের মাধ্যমে। যা মূলত ঋণ। এই সব ক্রেডিট কার্ডধারীদের কী সুবিধা প্রদান করা হবে তা স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

৪ এপ্রিল জারিকৃত সার্কুলারে বলা হয়েছে এমন- ‘করোনাভাইরাসের ভয়াবহ বিস্তারের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকদের পক্ষে প্রদেয় বিল নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। তাই ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের আর্থিক সামর্থ্য ও চলমান অন্যান্য সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যেসব ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকের বকেয়া বিল পরিশোধের শেষ তারিখ ১৫ মার্চ বা তার পরে, সেসব ক্ষেত্রে গ্রাহক প্রদেয় বিল নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ না করার ক্ষেত্রে কোনো বিলম্ব ফি, চার্জ, দণ্ড-সুদ, অতিরিক্ত মুনাফা, বা অন্য কোনো ফি বা চার্জ (যে নামেই অভিহিত হোক না কেন) আদায় না করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হলো। এছাড়া ১৫ মার্চ থেকে ইতিমধ্যে কোনো ক্রেডিট কার্ড বিল বিলম্বে পরিশোধজনিত কারণে বিলম্ব ফি, চার্জ, দণ্ড সুদ, অতিরিক্ত মুনাফা, বা অন্য কোনো ফি বা চার্জ (যে নামেই অভিহিত হোক না কেন) আদায় করা হয়ে থাকলে তা সংশ্লিষ্ট ক্রেডিট কার্ড গ্রাহককে ফেরত প্রদান অথবা পরবর্তী সময়ে প্রদেয় বিলের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এই নির্দেশনা ১৫ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।’

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করে ব্যাংকগুলো বিলম্ব ফি মওকুফ করলেও বেশ কিছু ব্যাংক সুদ গ্রহণের ক্ষেত্রে পুরোপুরি নির্দেশনাটি পালন করেনি বলেও অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি এ নির্দেশনার মেয়াদ আরও বাড়ানো উচিত বলেও মনে করেন অনেকেই।

আবার করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সাধারণ ছুটির সময়ে অফিস করা ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ভাতা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১২ এপ্রিল ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনা অনুযায়ী সরকারের সাধারণ ছুটিকালীন ১০দিন স্ব-শরীরে ব্যাংকে উপস্থিত হয়ে দায়িত্ব পালন করলে কর্মকর্তা-কর্মচারিরা অতিরিক্ত এক মাসের বেতন পাবেন। স্থায়ী ও অস্থায়ী সব ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারি এই সুবিধা পাবেন। আর এই অর্থের পরিমাণ ধরা হয় সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা। আর কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারি ১০ দিনের বেশি অফিসে উপস্থিত থাকলে আনুপাতিক হারে স্ব স্ব ব্যাংক থেকে যাতায়াত ভাতা দেওয়া হবে। গত ১২ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতিবিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্দেশনাটিও বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংক মানছে না বলে গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে। ফলে ছুটির সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অফিস করলেও মাসিক বেতনের বাইরে ওই ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা প্রণোদনার কোনো অর্থই পাচ্ছেন না। এটা চলতে থাকলে কাজের ক্ষেত্রে ব্যাংকাররা মনোবল হারিয়ে ফেলবেন। আর সেটা ঘটলে ক্ষতির মুখে পড়বে ব্যাংকগুলো। তাই এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ দেওয়া প্রয়োজন।

কারোনাকালীন সময়ে ব্যাংকগুলো কতটা সুরক্ষিত?
এ ক্ষেত্রে বেসরকারি ব্যাংকগুলো তাদের সাধ্যমতো স্বাস্থবিধি মেনে সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের চেষ্টা করলেও সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জেলা ও উপজেলার শাখাগুলো। নানা কারণেই যেখানে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণের উদ্যোগ মানা হচ্ছে না। ফলে এরই মধ্যে মুন্সীগঞ্জের সোনালী ব্যাংকের গজারিয়া শাখার পাঁচ কর্মকর্তা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এর আগে অগ্রণী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার দেহে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ায় ঢাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখা লকডাউন এবং ওই শাখার সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছিল।

বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন, সরকারি নানা সুবিধার ভাতাসহ অন্যান্য প্রয়োজনে সরকারি চারটি ব্যাংকে ভিড় সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। মাসের শুরুতে বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকেও গ্রাহকদের চাপ রয়েছে। ব্যাংকে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসে। তাদের মধ্যে কেউ ভাইরাস বহন করলে সেটা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে টাকার স্পর্শ মাধ্যমেও ছড়াতে পারে করোনাভাইরাস। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যাংকের শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট পয়েন্টের পাশাপাশি এটিএম বুথগুলো নিয়মিতভাবে জীবাণুমুক্ত করা এবং সেখানে হান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকারদের ঝুঁকির পাশাপাশি করোনাভাইরাসের সংক্রমণও ক্রমে বাড়ছে।

যখন লিখছি তখন করোনায় আক্রান্ত হয়ে দেশে আরও একজন ব্যাংক কর্মকর্তা মারা গেছেন। শহিদুল ইসলাম খান নামের এ কর্মকর্তা রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের রিসার্স অ্যান্ড প্ল্যানিং বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ছিলেন। এর আগে গত ২৬ এপ্রিল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বেসরকারি সিটি ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের এফভিপি মুজতবা শাহরিয়ার মুগদা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এভাবে বাড়ছে অন্যান্য ব্যাংকারদের আক্রান্তের সংখ্যাও।

ব্যাংকাররা বলছেন, অফিস-আদালত, যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও মানুষকে লেনদেনের প্রয়োজনে ব্যাংকে যেতে হচ্ছে তাদের। সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ব্যাংককর্মীদেরও যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক শাখায় ভিড় করা গ্রাহকরাও সামাজিক দূরত্বের নিয়মগুলোও ঠিকভাবে মানছেন না। ফলে তাতে বাড়ছে অস্বস্তিও। তাই সময়ক্ষেপণ না করে সারাদেশে ব্যাংকারদের সুরক্ষার পাশাপাশি সকল সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে কঠোরভাবে।

এছাড়া এটিএম বুথগুলোতেও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথের সংখ্যা ১০ হাজার ৯৬১টি। আর সিডিএম ও সিআরএম মেশিন রয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৪০৮টি ও ২৫৮টি। সারা দেশে পস মেশিনের সংখ্যা ৬০ হাজার ৪৭৪টি। অন্যদিকে, জানুয়ারি পর্যন্ত ডেবিট কার্ডের গ্রাহক ১ কোটি ৮৬ লাখ ১১ হাজার ৬৮১ জন আর প্রি-পেইড কার্ডের গ্রাহক ৪ লাখ ২৮ হাজার ৯১০ জন। এছাড়া নগদ অর্থ উত্তোলনে দেশে এটিএম বুথের ব্যবহার বাড়লেও হাতে গোনা কয়েকটি বাদে বেশিরভাগ ব্যাংকের এটিএম বুথে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। নেই কোনো জীবাণুনাশক উপকরণও। ফলে বুথ ব্যবহারকারী গ্রাহক ও বুথগুলোর নিরাপত্তাকর্মীদের মাধ্যমে করোনাভাইরাস কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সচেতনতার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকেও দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।

করোনাভাইরাস যুদ্ধে ব্যস্ত গোটা বিশ্ব। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও মুখে মাস্ক পরার পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়ে দূরত্ব বজায় রেখে চলাটা সকলেরই দায়িত্ব। প্রয়োজনেই আপনি ব্যাংকে যাবেন। তবে সেটি যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে হয়, সেটার দিকে আন্তরিক হতে হবে সকলকেই। মনে রাখতে হবে, আপনার সচেতনতাই আপনাকে করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত রাখবে।

Leave a Reply