ব্যাংকিং লেনদেনেও করোনার প্রভাব

0

করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে দেশের ব্যাংক খাতে। গত কয়েক দিনে লেনদেন কমেছে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। কমেছে আমানত ও ঋণ আদায়। ফলে তারল্য সংকটের আকার বাড়ছে। এমনটা অব্যাহত থাকলে জাতীয় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন অর্থ খাতের বিশ্লেষকরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের সার্বিক অর্থনীতি বিশেষ করে আর্থিক খাত ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। তারল্য সংকট বাড়বে, রপ্তানি আদেশ ক্রমাস্বয়ে কমে যাওয়ায় রাজস্ব আয় কমবে। নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ কমে যাবে। এতে করে নতুন কর্মসংস্থান মুখ থুবড়ে পড়বে। ফলে বেকারত্বের হার বাড়বে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর কয়েকটি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ঘুরে দেখা গেছে, গ্রাহকদের উপস্থিতি অন্য দিনের তুলনায় অনেক কম। কিছুটা অলস সময় কাটায় ব্যাংকাররা। কিছু কিছু ব্যাংকে দেখা গেছে, টাকা জমার পরিবর্তে উত্তোলনের পরিমাণ বেশি।

বেশকিছু ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মাসে আমানত অনেক কম এসেছে ব্যাংকে। কারণ হিসেবে তারা নয়-ছয় এবং করোনার প্রভাব উভয়কে দায়ী করেছেন। আদায়ও বেশ কমেছে। নতুন এলসি খোলা এবং নিষ্পত্তির পরিমাণও নেই বললেই চলে। এ সপ্তাহে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্সও কম এসেছে।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়তে শুরু করেছে। ব্যাংকগুলোর লেনদেন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমেছে।

এই মুহূর্তে ব্যাংক খাতে চ্যালেঞ্জ কি জানতে চাইলে তিনি জানান, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা। ৬০ শতাংশ ব্যাংকার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি মোকাবেলাই আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ছোট দেশে যদি করোনার প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তবে সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। আমাদের প্রথমেই দেখেতে হবে এটি কতদিন থাকবে। যদি ১ বা ২ মাস থাকে তবে আমাদের রিকোভারি করা সম্ভব হবে। কিন্তু যদি দীর্ঘ সময় এ ভাইরাস টিকে থাকে তবে অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের বড় খাত পোশাকশিল্প। আর এ খাতের বড় ক্রেতা ইউরোপের দেশগুলো। কিন্তু সে দেশগুলোতে করোনাভাইরাস ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। ফলে দেশগুলো থেকে প্রতিনিয়ত রপ্তানি আদেশ প্রত্যাহার হচ্ছে। অপরদিকে, নৌ এবং বিমান যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় আমদানিও ক্রমান্বয়ে কমছে। এতে করে ব্যবসায়ীরা সংকটের মধ্যে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, করোনার প্রভাব দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। কারণ দেশের রপ্তানি আদেশ প্রত্যাহার হচ্ছে বিভিন্ন দেশ থেকে। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সংকটে পড়বে। ব্যাংকঋণ প্ররিশোধ বাধাগ্রস্ত হবে। নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে না। ফলে বেকারত্ব বাড়বে।

তিনি বলেন, ‘এমনিতেই নয়-ছয়ের কারণে ব্যাংকগুলো আমানত পাচ্ছে না। এরপর আবার করোনার প্রভাব। এতে করে ব্যাংকের আমানত আরও কমবে। ফলে তারল্য সংকট হবে। ফলে নতুন ঋণ দিতে পারবে না।’

সংকট মুহূর্ত থেকে উত্তরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেন সাবেক এ গভর্নর। তিনি বলেন, ব্যাংকের পুনঃতফসিল সুবিধা বাড়ানো যেতে পারে। ব্যাংকঋণ গ্রহীতাদের সময় বাড়তে হবে। প্রয়োজনে ব্যাক টু ব্যাক লেনদেন সময় বাড়িয়ে ৬ মাস করা যেতে পারে। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। এর জন্য তারল্য সংকট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাংক ব্যবসা মন্দার দিকে যেন না যায় সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি। এ জন্য ট্রেজারি বন্ড, বিল কেনার পরামর্শ তার।

এদিকে করোনা ভাইরাসের কারণে ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতাদের জন্য বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী জুন পর্যন্ত কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধ না করলেও খেলাপি বলা যাবে না। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ ‘ঋণ শ্রেণিকরণ’-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে সব তফসিলি ব্যাংকের কাছে পাঠিয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ববাণিজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আমদানি ও রপ্তানিসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে করোনা ভাইরাসের কারণে চলমান বিরূপ প্রভাবের ফলে অনেক ঋণগ্রহীতাই সময়মতো ঋণের অর্থ পরিশোধে সক্ষম হবেন না মর্মে ধারণা করা যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে চলমান ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার এবং দেশে সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এসব বিবেচনায় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ঋণের শ্রেণিমান যা ছিল, আগামী ৩০ জুন ২০২০ পর্যন্ত সময়ে উক্ত ঋণ তদাপেক্ষা বিরূপমানে শ্রেণিকরণ করা যাবে না। তবে, কোনো ঋণের শ্রেণিমানের উন্নতি হলে তা যথাযথ নিয়মে শ্রেণিকরণ করা যাবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এর ৪৯ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনার ফলে, বর্তমানে কোনো ঋণগ্রহীতা যদি ৩০ জুন পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাহলে তাকে খেলাপি করতে পারবে না ব্যাংকগুলো। তবে যদি কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতা এই সময়ে ঋণ পরিশোধ করেন তাকে নিয়মিত ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারবে।