করোনা আতঙ্কে সাধারণ মানুষ, ব্যাংকে টাকা তোলার হিড়িক

0
151

করোনা আতঙ্কে দেশে সাধারণ ছুটির আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নগদ টাকা তোলার হিড়িক পড়েছে। বিশেষ করে মঙ্গল ও বুধবার স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ টাকা তুলেছেন গ্রাহকরা। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী টাকা সরবরাহ করতে অনেক ব্যাংকই হিমশিম খেয়েছে। সে জন্য অনেক নীতি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, টাকার কোনো সংকট নেই। যে যা চাচ্ছে তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সুতরাং দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। করোনাভাইরাসের কারণে মানুষ নগদ টাকা তুলে রাখছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ ছুটির প্রভাবও রয়েছে। এটা দ্রুত কেটে যাবে।

গতকাল রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় একাধিক সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের শাখায় গিয়ে দেখা যায়, গ্রাহকরা টাকা জমা দেয়ার পরিবর্তে তুলছেন বেশি। একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক জানান, ব্যাংকে আসা ৮০ ভাগ গ্রাহকই টাকা তুলতে এসেছেন। সে কারণে সাময়িক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এটা কোনো স্থায়ী সমস্যা নয়। এছাড়া এটিএম বুথগুলোতে বেশি হারে টাকা সরবরাহ করতে হচ্ছে। একই পরিস্থিতির কথা জানান, অন্য একাধিক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপকও।

জানতে চাইলে ইসলামী ধারায় পরিচালিত একটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক বলেন, মঙ্গল ও বুধবার টাকা তোলার খুব চাপ ছিল। ৮০-৮৫ ভাগ লোকই এসেছেন টাকা তোলার জন্য। মঙ্গলবার স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ এবং বুধবার দ্বিগুণ টাকা তুলেছেন গ্রাহকরা। নিঃশ্বাস ফেলতে কষ্ট হয়েছে।

একটি সরকারি ব্যাংকের শাখা ম্যানেজার বলেন, গত দুই দিনে যে পরিমাণ টাকা উত্তোলন করেছেন গ্রাহকরা, তা স্বাভাবিক কার্যদিবসের এক সপ্তাহের সমান। নগদ টাকা তোলার হিড়িক শুধু ঢাকা নয়, জেলা শহরেও ছিল।

অগ্রণী ব্যাংকের বগুড়ার একটি শাখা ম্যানেজার বলেন, গত দু’দিন বিপুল অঙ্কের টাকা তুলেছেন গ্রাহকরা। সে কারণে নগদ টাকার কিছুটা সংকট সৃষ্টি হয়। একজন গ্রাহক টাকা না পেয়ে রাগ করে চলে গেছেন। দুটি শাখার ব্যবস্থাপক জানান, গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী নগদ টাকা দেয়ার জন্য একাধিকবার অন্য শাখা থেকে টাকা আনতে হয়েছে। একই পরিস্থিতির কথা জানান একাধিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও (এমডি)।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, এমন পরিস্থিতিতে মানুষের নগদ টাকার দরকার হয়। তাই ব্যাংকে টাকা তোলার চাপ আছে। তবে ব্যাংকগুলোর প্রস্তুতিও ভালো। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কিছু নীতি সহায়তা দেয়ায় টাকা জমেছে। এছাড়া নতুন করে খুব বেশি ঋণ যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে টাকার জোগান ভালো।

এদিকে চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার ব্যাংকগুলোয় নগদ অর্থের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু সেদিন কলমানি বাজারে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। ফলে চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১২ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা ধার করতে হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। এর মধ্যে সাত দিন মেয়াদি রেপোতে ৪ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা, এক দিন মেয়াদি রেপোতে ৪ হাজার ২৭৪ কোটি ও অ্যাসিউরড লিকুইডিটি সাপোর্ট (এএলএস) হিসাবে ৪ হাজার ২০৩ কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া বিশেষ রেপোতে ধার দিতে হয়েছে ৬৯ কোটি টাকা।

বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারি ব্যাংকগুলোকেও রেপো ও এএলএস হিসাবে এ অর্থ দিতে হয়। পরদিন সোমবারও ব্যাংকগুলোকে ১১ হাজার ১৭১ কোটি টাকা ধার দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি মাসের শুরু থেকেই এ পরিস্থিতি চলছে মুদ্রাবাজারে।

কলমানি বাজার এবং রেপো, বিশেষ রেপো ও এএলএস সুবিধার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারির শুরুতেও দেশের কলমানি বাজারে দৈনিক ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছিল ব্যাংকগুলো। ৪ ফেব্রুয়ারি কলমানি বাজারে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়। এরপর থেকেই কলমানি বাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সামর্থ্য কমছে। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে কলমানি বাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। আর চলতি মার্চের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবেই কমেছে এ বিনিয়োগ, যা কমতে কমতে হাজার কোটি টাকার ঘরে নেমে এসেছে।

কলমানি বাজারে বিনিয়োগ কমায় বাড়তে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধারের পরিমাণ। ফেব্রুয়ারিতে রেপো ও এএলএস সুবিধার আওতায় ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহণের গড় ছিল ৫ হাজার কোটি টাকার ঘরে। মার্চে এসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। ১৬ মার্চ রেপো ও এএলএস সুবিধার আওতায় ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এরপর থেকে এ চাহিদা বেড়েই চলছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, দেশের কলমানি বাজার ধসে পড়েছে। এ বাজার শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে করোনাভাইরাসের প্রভাবই একমাত্র কারণ নয়। সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত তুলে নিচ্ছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ না দিয়ে সরকারি বিল-বন্ড কিনে নেয়ার প্রবণতাও এর কারণ। সামগ্রিক পরিস্থিতিকে দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের জন্য বিপজ্জনক বলেই মনে করছেন তারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, সাধারণ মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। করোনা প্রভাবের আগে থেকেই এ পরিস্থিতি দেখা গেছে। এখন তা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।