দৈত্যের নাম ‘সেলফিন’

0

হাতে নগদ কোনো পয়সা নেই। চেক বই খুঁজে পাচ্ছি না। কার্ডের পিন ভুলে বসে আছি। উদ্ধারের সবগুলো উপায় ব্যর্থ হয়েছে। অথচ টাকার খুব দরকার। ধার চেয়ে পেলাম না। টাকা কেউ হাতছাড়া করতে চায় না।

সম্ভাবনার সব দরজা থেকে বিতাড়িত হয়ে হতাশ মনে ঘরে ফিরলাম। পুরনো মালামালের স্তুপ থেকে খুঁজে বের করলাম পিতলের এক প্রদীপ। ধুলা-বালি পরিস্কার করে বিক্রি করে যদি কিছু পাওয়া যায়। পুরনো কাপড়ের টুকরো দিয়ে ঘষা দিতেই ভেসে আসল এক ভীতিকর গায়েবী আওয়াজ– ‍‍`হুকুম করুন মালিক’। আমি ভয় পেয়ে দুই হাত পেছনে সরে আসলাম। আমাকে ভয় পেতে দেখে অদৃশ্য কণ্ঠ হো হো করে হেসে উঠল। বলল-
-ভয় পাবেন না জাঁহাপনা। আমি এই প্রদীপের মালিকের গোলাম। আপনি যা আদেশ করবেন তাই পালন করব।

-চেক বই খুঁজে পাচ্ছি না। খুঁজে এনে দে।
-থানায় গিয়ে জিডি করেন।
-তুই না বললি তোকে যা আদেশ করব সব পালন করবি?
-এইটা বাদে যা বলবেন সব করব।
-চেক নাই। কার্ড নাই। আমার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলার ব্যবস্থা করে দে।
-পাগল নাকি! চেক ছাড়া টাকা তোলে ক্যামনে? কার্ড ছাড়া টাকা তোলা আমার কাজ নয়। এইটা বাদে অন্য যে কোনো আদেশ করেন।
-থানায় গিয়ে চেক হারানোর জিডি করে দে।
-বললাম না এটা পারব না।
-কেন পারবি না?
-না মানে থানায় গেলেই জিডি করার জন্য বখশিশ দেয়া লাগে। দৈত্যদের টাকা পয়সা থাকে না। থাকতে নেই। তাই পারব না।
আমি অদৃশ্য কণ্ঠের উদ্দেশ্য কড়া ধমক দিলাম। রাগ প্রকাশ করার জন্য প্রদীপ ধরে মেঝেতে আছাড় দিলাম। প্রদীপ ছিটকে দুইশ’ গজ দুরে গিয়ে পড়ল। রাগ প্রশমিত করার জন্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।

আপদ বিদায় হয়েছে মনে করে যেই উঠতে যাব অমনি আরেক গায়েবী আওয়াজ এসে হাজির।
-হুকুম করুন জাহাপনা।
-তুই কে আবার?
-আমি এক দৈত্য। পাশের বাড়ির প্রদীপের সাথে ছিলাম। প্রদীপের মালিক ঘষেনও না, আদেশও করেন না। অলস বসে ছিলাম। আপনার প্রদীপের দৈত্য আপনাকে সেবা দিচ্ছে না দেখে ছুটে এলাম আপনার হুকুম তামিল করতে।
-কিন্তু তোকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?
-ডিজিটাল যুগের দৈত্য আমি। আমাকে এত্ত সহজে দেখতে পারবেন না।
-প্রদীপের ইউজার ম্যানুয়াল অনুসারে প্রথমে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আসার কথা। তারপর তোর আবির্ভাব হওয়ার কথা। কিন্তু কিছুই তো মিলছে না।
-আমার প্রদীপের মালিক প্রদীপটি ক্যাশব্যাক অফারে কিনছিলেন। সেই কারণে প্রদীপের বিক্রেতা ধোঁয়ার কুণ্ডলী ফিচারটি বাদ দিয়ে বাজারে ছেড়েছে। তবে আমাকে দেখতে পারবেন।
-কীভাবে দেখব? কখন দেখব?
-আমাকে দেখতে হলে ডিজিটাল উপায়ে আদেশ করতে হবে। সে জন্য আপনাকে প্রথমে স্টোর রুমে যেতে হবে।
আমি দৌড়ে স্টোর রুমের দিকে গেলাম। অদৃশ্য দৈত্যটি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, ওস্তাদ ওই স্টোর না। গুগল প্লে স্টোরে গিয়ে আমার নাম ধরে সার্চ দেন। দেখবেন বান্দাহ হাজির।
আমি স্মার্টফোন হাতে নিলাম। প্লে স্টোরে গিয়ে খুঁজতে লাগলাম দৈত্যটার ছবি। কোথাও পাচ্ছি না। খুঁজতে খুঁজতে যখন হয়রান, তখন আবার অদৃশ্য দৈত্য কথা বলে উঠল। আরে এভোবে খুঁজলে কি পাবেন? আমার নাম ধরে ডাক দেনে।

-তোর নাম কী?
-সেলফিন।
-সেলফিন মানে কী? এতো দেখছি অদ্ভুত নাম!
-দৈত্যদের নাম একটু অদ্ভুত কিসিমের হয়।
আমি ইংরেজি বানানে সিইএল টাইপ করতে না করতেই বান্দা হাজির। লাল সবুজের কম্বিনেশনে দারুণ এক রূপ দৈত্যটার। মুক্তোর মতো হরফে তার নাম লেখা ‘সেলফিন’।
-তোর নামের ব্যখ্যাটা কি বলবি একটু?
– ‘সেল’ মানে মোবাইল ফোন। আর ফিন্যান্স থেকে ‘ফিন’। মানে হলো হাতের মুঠোয় ফিন্যান্স।
-তোকে আনল কারা?
-আমাকে এনেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।
-বুঝলাম। তো তুই কি আমার আদেশ পালন করতে পারবি?
-চেক ছাড়া কার্ড ছাড়া টাকা তুলবেন এই তো?
-আপাতত এই হুকুম তামিল করলেই হবে।
-আমাকে দরজা খুলে আপনার ঘরে ঢুকতে দিন। মানে ইনস্টল করুন। আমি চেক ছাড়া টাকা তোলার ব্যবস্থা করব।
এবার আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। পাগল দৈত্যটা কয় কী! হাতি ঘোড়া গেল তল, পিঁপড়া বলে কত জল! যত্তসব।

আমার এ কথা দৈত্যটার ইগোতে খুব লাগল। কিন্তু সে তো আমার গোলাম। তাই রাগ সংবরন করে বলল, ইনস্টল করেই দেখুন না।
আমি তার অনুরোধে সেলফিন দৈত্য মোবাইল ফোনে ইনস্টল করলাম। জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধন করলাম। লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে নিজেকে নিজে চোখ মেরে সেলফি তুলে সেলফিন ইনস্টল সম্পন্নও করলাম। দৈত্য নির্দেশনা দেয়, আমি একধাপ এগোই। দৈত্য থামতে বলে আমি থামি। এভাবে করে কয়েক মিনিট সময় ব্যয় করে দৈত্যের ইনস্টলেশন শেষ করলাম। এবার দৈত্য আমায় বলল, ‘আপনার অ্যাকাউন্টটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট মেনুতে গিয়ে অ্যাড করে নিন। অতঃপর কন্ট্যাক্ট সেন্টারে ফোন করে অ্যাপ্রুভ করিয়ে নেন।
কথা না বাড়িয়ে দৈত্যের নির্দেশনা মতো সব কাজ শেষ করলাম। দৈত্যের মুখে ফুটে উঠল প্রশান্তির ছাপ। হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি মৃদু ধমকের সুরে বললাম,
-সব তো করলাম। এবার আমায় টাকা তোলার ব্যবস্থা করে দে!
-চেক ছাড়া?
-নয় তো কী?
-কার্ড ছাড়া!
-ভণিতা করিস না। মারব এক থাপ্পড়।
-আহা! আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? আমি কি বলছি পারবেন না। যান মিয়া ক্যাশ উইথড্র মেনুতে। ফ্রম এটিএম সিলেক্ট করুন। কোন অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উঠবে সেটাও দেখিয়ে দিন। অতপর সাবমিট দিলেই দেখবেন একটি গোপন নাম্বার তৈরি হয়ে গেছে। এটা নিয়ে কাছের কোনো এটিএম বুথে চলে যান।

আমি সেলফিন দৈত্যের কথা অনুসারে সব কাজ শেষ করে এটিএম বুথে চলে গেলাম। কিন্তু সেখানেও কোনো কুল কিনারা পাচ্ছি না দেখে সেলফিন এগিয়ে আসল। বলল, কার্ডবিহীন লেনদেন অপশনে ক্লিক করুন। সেলফিন নাম্বার অর্থাৎ যে নাম্বার ব্যবহার করে আমাকে ইনস্টল করেছেন সেই নাম্বার দেন। তারপর কত টাকা তুলতে চান সেটা উল্লেখ করুন।

আমি সুযোগ পেয়ে দিয়ে দিলাম বিশ হাজার। ওমা! কমান্ড দেয়ার সাথে সাথে এটিএম মেশিনের ভেতর থেকে ঘড়ঘড় আওয়াজ হতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরেই ডালা খুলে গেল। ফাঁক দিয়ে মুখ বের করে মুচকি হাসছে কতগুলো একহাজার ও পাঁচশত টাকার কড়কড়ে নোট।
আমি খপ করে টাকাগুলো ধরে ফেললাম। এই সুযোগ কি আর হাতছাড়া করা যায়! এভাবে করে তিনবারে পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলে ফেললাম। মনে হল পৃথিবী জয় করে ফেলেছি। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করে যতটা আনন্দ পেয়েছিল, আমি তার কয়েকগুণ আনন্দ পেলাম। দুই চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
সেলফিন দৈত্য আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারল। সে মুচকি হাসি দিয়ে বলল, শুধু কটা টাকা তুলতে পেরেই এত্ত আনন্দ! আমি তো আরো অনেক আদেশ পালন করতে পারি। এই ধরেন, মোবাইল রিচার্জ করে দেয়া, বিদ্যুৎ বিল পেমেন্ট করে দেয়া, ইসলামী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে অ্যাড মানি করে দেয়া, এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য যে কোনো অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো, এমন কি অন্য ব্যাংকে পর্যন্ত টাকা পাঠিয়ে দিতে পারি মুহূর্তের মধ্যে।
আমার চোখ তো ছানাবড়া! আমি জিজ্ঞেস করলাম, আর কী কী পারিস তুই?
দৈত্য বলল, আমি ঘরে বসেই অ্যাকাউন্ট খুলে দিতে পারি। অন্য ব্যাংকের কার্ড থেকে টাকা অ্যাড করতে পারি। ইসলামী ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং এমক্যাশেও টাকা পাঠাতে পারি।
আমি দৈত্যের ক্ষমতাগুলোর তারিফ করলাম এবং সুযোগ বুঝে তাকে মুঠোফোনে আটকে ফেললাম। ওর সবগুলো ক্ষমতা পরখ করে দেখতে হবে।

সেলফিন দৈত্যকে নিজের হাতে মুঠোয় রাখতে ডাউনলোড করুন এখান থেকে ডাউনলোড

কার্টেসি: Shahriar Masum

Leave a Reply