ব্যাংকের কল সেন্টারে গ্রাহকের যত বিড়ম্বনা

একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের গ্রাহক আল হোসেন চিশতি তার ক্রেডিট কার্ডের স্টেটমেন্টের ব্যাপারে ব্যাখ্যার জন্য ব্যাংকের কল সেন্টারে ফোন করেছিলেন।একজন কর্মকর্তার সঙ্গে সংযুক্ত হতে তাকে ১৩ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা পেশায় ব্যবসায়ী চিশতী বলেন, ‘ব্যাপারটা ছিল খুবই বিরক্তিকর। অপেক্ষার পুরো সময়টা ফোনে আমাকে ব্যাংকের বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন শুনতে হয়েছে। বিজ্ঞাপন শুনে বিরক্তি আরও বেড়ে গেছে।’

তিনি আরও হাজারো গ্রাহকদের মধ্যে একজন, যাদের অনেকের অভিজ্ঞতাই এরকম। আরও দেখুন: ঘরে বসে যত ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে ইসলামী ব্যাংক

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

আরেকজন গ্রাহক জানান, একবার তার ক্রেডিট কার্ডের অনিয়মিত একটি লেনদেনের বিষয়ে ব্যাংকে জানানোর জন্য তিনি হন্যে হয়ে চেষ্টা করছিলে। প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা করেও কল সেন্টারে তিনি অভিযোগ জানাতে পারেননি।

পরে ওই ব্যাংকের এক কর্মকর্তার সহায়তা নিয়ে তিনি কল সেন্টারে এক জনের সঙ্গে কথা বলেন।

আরেকজন গ্রাহক জানান, তিনি দিনের বেলায় কখনো ব্যাংকের কল সেন্টারে কাউকে পান না, তাই যেকোনো প্রয়োজনে রাতে কল করেন। এমন ভোগান্তিতে গ্রাহকদের অনেকেই এখন ব্যাংকের সেবা নিয়ে হতাশ।

কল সেন্টারের সেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকে গ্রাহকদের অভিযোগ জমছিল। তারা বলেছেন, ন্যূনতম ৫ থেকে ২০ মিনিট অপেক্ষায় রাখার পর তাদের কলগুলো গ্রহণ করা হয়। অপেক্ষার এই সময়টায় ফোনের বাড়তি খরচ গ্রাহকদেরই বহন করতে হয়। এতে তাদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়।

মোবাইল থেকে কল সেন্টারে ফোন করে ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হলে গ্রাহককে ২৬ টাকা ৬০ পয়সা খরচ করতে হয়। অর্থাৎ প্রতি মিনিট অপেক্ষায় থাকার জন্য ২ টাকা ৬৬ পয়সা করে খরচ গুনতে হচ্ছে গ্রাহককে। গতকাল একটি ব্যাংকের কল সেন্টারে ফোন করে খরচের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নথি থেকে জানা গেছে, ব্যাংকের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়ার আগে যে সময়টা গ্রাহককে অপেক্ষায় থাকতে হয়, সেই পুরো সময় ব্যাংক তাদের বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন শোনায়।

গ্রাহকরা এভাবে নিজের টাকা খরচ করে ব্যাংকের বিজ্ঞাপন শুনতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে বলা হয়, ‘এটি কোনো ভালো চর্চা নয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, এই সমস্যার সমাধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু প্রস্তাব দিয়েছে।

খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, কল সেন্টারগুলোকে গ্রাহক কল করার এক মিনিটের মধ্যে তা গ্রহণ করতে হবে। এতে গ্রাহকের সেবা নিতে খরচ কমবে।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (এনবিএফআই) গ্রাহক সেবার জন্য চ্যাটবট চালু করতে হবে।

চ্যাটবট হচ্ছে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম যেটি ভয়েস অথবা টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের অনুকরণ করে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ফোন, ইমেইল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রথাগত গ্রাহক সেবার পাশাপাশি গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য এটি ব্যবহার করে থাকে।

ব্যাংক ও এনবিএফআইদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গ্রাহকদের চ্যাটবট সেবা পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে বলা হয়েছে, ‘প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে চ্যাটবট চালু করা হলে কল সেন্টারে কল করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাবে।’

চারটি ব্যাংক ইতোমধ্যে চ্যাটবট চালু করেছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালে সেবাটি চালু করে।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এটি এখনো জনপ্রিয় হয়নি। আমরা ইতোমধ্যে এই সেবাকে আরও গতিশীল করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ভয়েস মেসেজ সেবাও গ্রাহকদের সমস্যা সমাধানের আরেকটি বিকল্প পদ্ধতি হতে পারে। এই সেবার আওতায় গ্রাহকরা কল করে ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে তাদের সমস্যাগুলো জানাতে পারবেন। কল সেন্টারের কর্মকর্তারা রেকর্ড করা মেসেজ শুনে পরে গ্রাহকদের সঙ্গে সমস্যা সমাধানের জন্য যোগাযোগ করতে পারবেন।

প্রস্তাবগুলো গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি বিভাগের কাছে পাঠানো হয়েছে, যেটি গ্রাহকদের কাছ থেকে আসা সমস্যা নিয়ে কাজ করে থাকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা দ্রুততম সময়ে গ্রাহকদের ভোগান্তি কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব।’

সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন জানান, তারা ইতোমধ্যে এ ধরনের দুটি সেবা চালু করেছেন, যার মাধ্যমে গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘একটি হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যাংকিং, যার মাধ্যমে আমরা দৈনিক গড়ে সাড়ে তিন শ সমস্যা পাই। আমরা সিস্টেমের মাধ্যমে তাদেরকে উত্তর দেই।’

অপর সেবাটি হচ্ছে স্মার্ট ইন্টারঅ্যাক্টিভ ভয়েস রিকগনিশন সিস্টেম (এসআইভিআর), যার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার সমস্যা সম্পর্কে জানতে পারছেন। সোর্স: দিন ডেইলি স্টার।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button