করোনাকালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনা

0

প্রায় আঠারো কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের দু’তৃতীয়াংশ মানুষ এখানো ব্যাংকিং সেবার বাইরে। দেশের সুষম ও টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনে ব্যাংকিংয়ের আওতা বহির্ভূত এই বিপুল জনগোষ্ঠী আর্থিক সেবার আওতায় এনে অর্থনৈতিক মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।

তদপুরি অর্থনৈতিক উদীয়মান শক্তির দেশ হিসেবে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির মহাসড়কে উঠার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবেও দেশের সক্ষম সকল নাগরিকের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনা জরুরি। আর সে জন্য প্রয়োজন দেশের সক্ষম সকল নাগরিকের ব্যাংক একাউন্ট থাকা।

সাধারণত: শহরাঞ্চলের ব্যাংক শাখায় যারা স্বউদ্যোগে হিসাব খোলার জন্য আসেন, তাদের হিসাবই খোলা হয়। আবার কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সকল ব্যাংকই গ্রামীণ স্বল্প আয়ের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের একাউন্ট খুলতে আগ্রহীও হয় না। ফলে এ শ্রেণির গ্রাহকও বিশেষ পরিস্থিতিতে বাধ্য না হলে ব্যাংকমুখী হন না। আর এভাবেই ব্যাংকিং সেবার বাইরে থেকে যান এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্টি। ফলে তাদের অর্থনীতির একটা বৃহৎ অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে থেকে যায়।

এহেন পরিস্থিতিতে প্রচলিত ব্যাংকিং ধারণার বাইরে এমন এক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রয়োজনের কথা অনুভূত হয় যেখানে ব্যাংক খোলাই হবে প্রধানত: ব্যাংকিং সুবিধা বঞ্চিত (Unbanked) জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে। কারণ, প্রচলিত পদ্ধতির শাখা ব্যাংকিং যা সাধারণত: শহর এলাকায় স্থাপিত তা দিয়ে সকল নাগরিকের ব্যাংক একাউন্ট খোলা সম্ভব নয়। আবার শাখা পরিচালনার ব্যয়ভারিক্কির কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য গ্রামাঞ্চলে শাখা খোলা যৌক্তিকও হয় না।

সামগ্রিক বিবেচনায় আমাদের দেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিকট তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে স্বল্প পরিচালন ব্যয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাংকিং সেবার বিষয়টি সামনে আসে।

ইতিমধ্যে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ধারণার কথা জানা যায়। একই সাথে পেরু, কলম্বিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে এর সফল অগ্রযাত্রাও চোখে পড়ে। ব্যাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থার চালু করার সম্ভাবনা নিয়ে ভাবনা শুরু করেন নানা কর্তৃপক্ষ। শুরু হয় পরীক্ষা নিরীক্ষাও। এরপর বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ শুরু হয় ২০১৪ সালে ব্যাংক এশিয়ার মাধ্যমে একটি পাইলট প্রকল্প নিয়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। পাইলট প্রকল্প নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান এবং লৌহজং উপজেলায়। পাইলট প্রকল্পে সম্ভাবনার আভাষ মিলায় দেশের নানা প্রান্তে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ শুরু করে ব্যাংকটি।

সবার আগে মার্কেটে আসার নায্য সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাংক এশিয়া স্থানীয় সরকার বিভাগের সাথে চুক্তি করে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় সংযুক্ত এজেন্ট শাখা খোলার অনুমতি লাভ করে। ফলে এজেন্ট শাখার ভারসাম্যপূর্ণ এবং সময়োচিত বিস্তৃতিকরণের সুফল তারা এককভাবে ভোগ করে বেশ কয়েক বছর।

প্রথম দিকে দেশের অনেক ব্যাংক এ বিষয়টিকে খুব গুরুত্বের সাথে না নিলেও ব্যাংক এশিয়ার পাশাপাশি আরো কিছু ব্যাংক সক্রিয় হয়। ইতিমধ্যে ডা্চ বাংলা ব্যাংকও কাজ শুরু করে এবং অতি দ্রুত ব্যাংকটি শাখা সংখ্যা বিচারে ব্যাংক এশিয়াকেও পেছনে ফেলে সামনে চলে আসে। পাশাপাশি কাজ শুরু করে আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক। এগিয়ে আসে রাষ্ট্রায়ত্ব অগ্রণী ব্যাংক ”দুয়ার” ব্র্যান্ডিং নিয়ে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত সারাদেশে সকল ব্যাংকের এজেন্ট সংখ্যা ৯ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

সব ক্ষেত্রে অগ্রগামী থাকলেও এক্ষত্রে পেছন থেকে হঠাৎই জোরেশোরে কাজ শুরু করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ইসলামী ব্যাংক ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে শাখাগুলোর প্রতি প্রথম নির্দেশনাপত্র জারি করলেও বাস্তবে কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৮ তে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি এজেন্ট খুলে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ব্যাংকগুলোর কাতারে শামিল হয়। এরপর ২০২০ সালে আরো এক হাজার নতুন এজেন্ট খুলে এজেন্ট সংখ্যা দু’হাজারে উন্নীত করার এক মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়।

চলতি ২০২০ সালের শুরু থেকেই এজেন্ট শাখা খোলার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ আরম্ভ হয়। কিন্তু কোভিড১৯ মহামারির কারণে নেমে আসা স্থবিরতায় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সাময়িক বাধার মুখে পড়ে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যাংকিং এবং দাফ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রথম সুযোগেই জুলাই থেকে প্রায় পুরোদমে শুরু হয় এজেন্ট কেন্দ্র উদ্বোধনের কাজ। ন্যূনতম আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে খোলা এসব এজেন্টও অনতিবিলম্বে গ্রাহকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

এক ভয়াবহ বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সারা দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণে ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোগকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বিপ্লব সাধনের ইঙ্গিত বলেই ধারণা করছেন অভিজ্ঞ মহল। দেশের প্রতিটি প্রান্তের সকল গুরুত্বপূর্ণ বাজার/হাট কভার করে বছর শেষে দু’হাজার এজেন্ট আউটলেট খোলার মহাপরিকল্পনায় ‍ইতিমধ্যে প্রায় ৯০% সাফল্যও অর্জিত হয়েছে। এজেন্ট খোলার চলমান গতিধারায় বছর শেষে ব্যাংকটির এজেন্ট সংখ্যা দু’হাজার ছাড়িয়ে যাবে সহজেই।

ইসলামী ব্যাংকের এজেন্টের বিশেষ দু’টি তাৎপর্যপূর্ণ দিকের একটি হলো, প্রায় প্রতিটি এজেন্ট আউটলেটের সাথে থাকছে এটিএম বুথও। এজেন্ট প্রতি এটিএম দিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা বিস্তৃতির এমন পরিকল্পনা বাংলাদেশ তো বটেই বিশ্বেও সম্ভবত: প্রথম। এজেন্টে হিসাব খোলা গ্রামীণ মানুষদেরও দশটা-চারটার ব্যাংকিং সময়ের বাধ্যবাধকতামুক্ত ব্যাংকিং সেবা নেবার এমন সুযোগ তাদের বৈষয়িক এবং মানসিক অবস্থানকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে।

অপর তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ইসলামী ব্যাংকের মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস তথা ”এমক্যাশ” অপারেশনকে এজেন্ট সার্ভিসের সাথে সংযুক্ত করে দেয়ার ব্যবস্থাও গ্রহণ। একই ব্যাংক এজেন্টকে আলাদা চুক্তির মাধ্যমে এমক্যাশ এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করা হচ্ছে। এরপর তাদের অধীনে রিটেইলার নিয়োগ দিয়ে এমক্যাশ অপারেশন করা হবে। এর ফলে এই ব্যাংকের এই প্রোডাক্টটির জনপ্রিয়তা বাড়ার পাশাপাশি এজেন্টের বর্ধিত আয়েরও ব্যবস্থা হবে বলে আশা করা যায়।

একইসাথে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ হচ্ছে এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনারও। দারিদ্র বিমোচনে উদ্দেশ্য সফল ইসলামী ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প তথা আরডিএস এর আদলে বিনিয়োগ কার্যক্রমের মাধ্যমে এজেন্ট কেন্দ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে আরো একটি নয়া অধ্যায়ের সূচনা হবে।

লেখক:মো. মোসলেহ উদ্দিন, কবি, প্রাবন্ধিক ও ব্যাংকার

Leave a Reply