ব্লকচেইন বিপ্লব ও বাংলাদেশের ব্যাংকিং

একসময় বড় বড় লেজার বইয়ে ব্যাংকের যাবতীয় হিসাব-নিকাশ রাখতে হতো। যাবতীয় লেনদেন রেকর্ড করার জন্য সকল শাখায় একটা বড় সাইজের লেজার বুক থাকত। সময়ের পরিক্রমায় কোর ব্যাংকিং সল্যুশন ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।

ব্যাংকিং চলে আসে মানুষের ঘরে, হাতের মুঠোয়। এই প্রযুক্তিতে সকল লেনদেনের তথ্য থাকছে কেন্দ্রীয় ডেটাবেইজে। তবে এই প্রযুক্তিতেও দুটি বড় ঘাটতি থেকে যায়; একটি হলো নিরাপত্তা ঝুঁকি, অন্যটি হলো তাত্ক্ষণিক বৈশ্বিক লেনদেন করতে না পারা। এই ঘাটতি পূরণে প্রযুক্তির পথপরিক্রমায় নতুন সুযোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ব্লকচেইন, যার গতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সহ অনেক বৈশিষ্ট্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এই প্রযুক্তি বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থায়নে দ্রুত পরিবর্তন আনছে। সারাবিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্লকচেইন প্রযুক্তি বিপ্লব আনতে চলেছে। সেই বিপ্লবের ঢেউ বাংলাদেশেও এসে পড়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই প্রযুক্তি গ্রহণ করে গ্রাহকদের আরও উন্নততর সেবা দিচ্ছে।

ব্লকচেইন প্রযুক্তিকে সামপ্রতিক সময়ের এক অভিনব উদ্ভাবন বলা হচ্ছে। ব্লকচেইন হলো তথ্য সংরক্ষণে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে নিরাপদ ও উন্মুক্ত পদ্ধতি। সাতোশি নাকামতো ছদ্মনামের এক ব্যক্তি বা গ্রুপকে ব্লকচেইন প্রযুক্তির উদ্ভাবক বলে মনে করা হয়। ২০০৯ সালে বিটকয়েন সফটওয়্যার প্রকাশিত হওয়ার পরই বিশ্বব্যাপী ব্লকচেইন প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটে।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

একটা ভ্যালিড ট্রানকেজশানের জন্য অবশ্যই ব্যাংকের ডেটাবেইজে সেটার এন্ট্রি থাকতে হয়; আগে যেটার এন্ট্রি থাকত লেজারে। ব্লকচেইন এরকম একটা লেজার, যেখানে পাশাপাশি একটার পর একটা অনেকগুলো ব্লক থাকে। প্রত্যেকটা ব্লকের ভিতর থাকে একটা সময়ের মাঝে সারা পৃথিবীতে যত ট্রানজেকশান হয়েছে সেটার সকল ডেটা। এই ডেটা ওপেন কিন্তু এনক্রিপ্টেড অর্থাত্ সবাই দেখতে পারবে এই ডেটা কিন্তু পড়তে গেলে ‘প্রাইভেট কী’ লাগবে। অর্থাত্ আপনি যদি এখানে ট্রাঞ্জেকশান করে থাকেন তাহলে শুধুমাত্র আপনি এখান থেকে আপনার ট্রানজেকশনের সকল তথ্য সেটার প্রাইভেট কী ব্যবহার করে পড়তে পারবেন, অন্য কেউই পারবেনা। তবে মানুষ যেটা দেখবে তা হল ট্রানজেকশনের পরিমাণ। তবে কার অর্থ কার কাছে গিয়েছে সেটা এভাবে জানা যাবেনা।

ব্লকচেইন প্রযুক্তি লেনদেনের গতি এবং দক্ষতায় বিপ্লব ঘটাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এই প্রযুক্তিটির প্রয়োগ যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে; তবে প্রযুক্তিবিদরা এ বিষয়ে অনেকটাই একমত যে, ব্যাংকিং, বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, বীমা এবং সরকার সহ বিভিন্ন শিল্প ও খাতে এটি ইতিবাচক ভূমিকা নিতে সক্ষম।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্লকচেইনের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো তাদের ফান্ডে পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে যেকোন সময়ে প্রায়-তাত্ক্ষণিক প্রবেশাধিকার পেতে পারে। কোম্পানির চলতি মূলধন ও নগদ অর্থের বৈশ্বিক প্রয়োজন মেটাতে নগদ অর্থের লেনদেন অবিচ্ছিন্ন গতিতে চলতে পারে। আর এক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি বর্তমান সময় পর্যন্ত আবিস্কৃত যেকোন প্রযুক্তির চেয়ে কম। অর্থাত্, ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সবচেয়ে শক্তিশালী।

রিয়েল টাইম সেটেলমেন্টের সক্ষমতা, হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি হ্রাস এবং আরও অগ্রসর অটোমেশনের জন্য ব্যাংক খাতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ডিজিটালাইজেশন এন্ড ক্লায়েন্ট এক্সেসের বৈশ্বিক প্রধান গৌতম জৈন ব্লকচেইনকে একটি ‘বৈপ্লবিক প্রযুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিবিসি’কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, “এই বিপ্লবের সঙ্গে আমরা কি করবো তা সময়ই বলে দেবে। আশাকরছি, সমাজের আর অগ্রসরতার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রযুক্তির শক্তি কাজে লাগাতে সক্ষম হবে; বিশেষ করে ব্যাংকগুলো বিশ্ববাণিজ্য এবং আর্থিক সেবাকে আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে। বৈশ্বিক গোষ্ঠীগুলোকে আরও সংযুক্ত করতে ও আমাদের সমাজকে আরও বিকশিত করতে এই প্রযুক্তি ভূমিকা রাখবে।”

আরও দেখুন: দেশে প্রথম ব্লকচেইন এলসি চালু করল স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক

ব্লকচেইন কি?

ব্লকচেইন অর্থ হচ্ছে ব্লক দিয়ে তৈরি চেইন বা ব্লকের চেইন। অনেকগুলো ব্লককে একটির সাথে আরেকটি জোড়া দেওয়ার মাধ্যমে ব্লকের একটি শিকল তৈরি করাই হচ্ছে ব্লকচেইন। যে ব্লকগুলোর দ্বারা এই চেইনটি তৈরি করা হয় সেই ব্লকগুলো মূলত তথ্য সংরক্ষণ করে। মূলত ব্লকচেইন হচ্ছে একটি ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার, যেটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। ব্লকচেইনের ব্লকগুলোর মধ্যে যখন একটি তথ্য ইনপুট দেওয়া হয় তখন ওই তথ্য ডিলিট করা বা ডেটাটির কোন ধরনের পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। সম্পূর্ণ ব্লকচেইনের প্রত্যেকটি সিঙ্গেল ব্লকে মূলত তিনটি জিনিস থাকে- ডেটা, হ্যাশ এবং চেইনে তার আগের ব্লকটির হ্যাশ। অর্থাত্, ব্লকচেইনের থাকা প্রত্যেকটি ব্লকে থাকে সেই ব্লকটির নিজস্ব ডেটা, ব্লকটির নিজের হ্যাশ এবং ঠিক তার পেছনে যুক্ত থাকা আগের ব্লকটির হ্যাশ। হ্যাশ হচ্ছে মূলত একটি আইডেন্টিফায়ার। প্রত্যেকটি ব্লকের হ্যাশ তার একেবারেই নিজস্ব এবং প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট। অর্থাত্, দুটি ব্লকের হ্যাশ কখনোই এক হবেনা। এই বিষয়টি অনেকটা মানুষের ফিঙ্গারপ্রিন্টের মত। দুটি মানুষের ফিঙ্গারপ্রিন্ট যেমন এক হতে পারবে না কখনোই, তেমনি দুটি ব্লকের হ্যাশও কখনো মিলবে না। আর এই হ্যাশগুলো জেনারেট হয় প্রত্যেকটি ব্লকের স্টোর করা ডেটা অনুযায়ী। যার মানে, একটি ব্লকের ডেটা যদি কোনরকম পরিবর্তন করা হয়, তাহলে ওই ব্লকটির হ্যাশও চেঞ্জ হয়ে যাবে। প্রত্যেকটি ব্লক যদি তার আগে যুক্ত থাকা হ্যাশটিও রাখে, তাহলে কোন ব্লকের ডেটা কেউ ইচ্ছামত চেঞ্জ করে ফেলতে পারবে না। তাই ব্লকচেইনে ইনপুট দেওয়া কোন ডেটা মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, এক্ষেত্রে আপনি যদি একটি ব্লকে থাকা ডেটা পরিবর্তন কর‍তে চান তাহলে আপনাকে ওই ব্লকটির সাথে তার আগের সবগুলো ব্লকের ডেটা পরিবর্তন করতে হবে। নাহলে সম্পূর্ণ ব্লকচেইনটি ইনভ্যালিড হয়ে যাবে বা কাজ করবে না আর।

ব্লকচেইন কিভাবে কাজ করে?

ব্লক চেইন হ্যাশ ফাংশন দিয়ে কাজ করে। হ্যাশ ফাংশন যেকোনো ছোট বা বড় শব্দ বা বাক্যকে সমান দৈর্ঘ্যের সংকেতে পরিণত করতে পারে। মূল শব্দ বা বাক্যের দৈর্ঘ্য যাই হোক না কেন, হ্যাশ ফাংশন থেকে যে হ্যাশ বেরোবে, তার দৈর্ঘ্য সমান। প্রতিটি লেনদেনের তথ্য হ্যাশ ফাংশনের মাধ্যমে সংকেতাবদ্ধ করে তারপর ব্লকে যোগ করা হয়। বিটকয়েন বা যেকোনো ক্রিপ্টোমুদ্রায় হ্যাশ গুরুত্বপূর্ণ। বিটকয়েনে এসএইচএ-২৫৬ হ্যাশ ব্যবহার করা হয়, যেটা সাইবার নিরাপত্তার জন্য প্রথম সারিতে পড়ে। এসএইচএ-২৫৬ আমেরিকার এনএসএর (ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি) আবিষ্কার। এই হ্যাশ ফাংশন, যেকোনো শব্দমালাকে ২৫৬ দীর্ঘ সংকেতে পরিণত করে। নিচে উদাহরণ দেওয়া হলো-

bangladesh: 8 E 07 DF 26128 D8 A 78474 DC 525 BF0 F0 A 16 AFA 49344 E1 ED 4229692 E 13 B 313 DE 46 A8

Bangladesh: 2 F1 D 47 EB 679 BB 05 E6 D8 FE 039 AF 1563549588 CD 44 B 40 BE6 B 1013 EA8 CA 2268845 F

লক্ষণীয় যে শুধু প্রথম অক্ষরটি বড় করে লেখায় দ্বিতীয় হ্যাশটি প্রথম হ্যাশের থেকে ভিন্নরূপ ধারণ করেছে। সে কারণেই তথ্যের সামান্য পরিবর্তন হলেও হ্যাশে তা সহজে ধরা পড়বে। আবার দুটি হ্যাশ দেখে বোঝার উপায় নেই, তাদের মূল শব্দ দুটো কাছাকাছি ছিল।

ব্লকচেইনের এই হ্যাশ একমুখী। এর অর্থ হলো, একটা শব্দ বা বাক্যকে ফাংশনটি হ্যাশ করতে পারবে, কিন্তু সেই হ্যাশ থেকে আবার শব্দটি বের করার উপায় নেই। এমন কোনো ফাংশন কখনোই লেখা সম্ভব নয়। পাসওয়ার্ডের উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, জামানের পাসওয়ার্ড ‘রূপালী ১৯৮৮’। সে ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এটি ঢোকাল। ওয়েবসাইট এসএইচএ-২৫৬ হ্যাশ ব্যবহার করে পাসওয়ার্ডকে হ্যাশ করল। সেই হ্যাশটি শুধু ডেটাবেইসে রাখা হলো। এখন কেউ সেই ডেটাবেইসে হ্যাশ করে রাখা পাসওয়ার্ড দেখলেও সে কিন্তু তা থেকে প্রকৃত পাসওয়ার্ড জানবে না। আবার এমন কোনো ফাংশন লেখা সম্ভব নয়, যেটা ওই হ্যাশকে জামানের ঢোকানো পাসওয়ার্ডে রূপান্তরিত করতে পারবে। যখন জামান লগইনের জন্য তাঁর পাসওয়ার্ড ঢোকাবে, তখন সেটিকে সিস্টেম প্রথমে হ্যাশ করবে। সেই হ্যাশ অবিকল আগেরটির মতোই হবে, তারপর তাকে ডেটাবেইসে সংরক্ষিত হ্যাশটির সঙ্গে মেলানো হবে। হ্যাশ মিললেই বুঝতে হবে শব্দও মিলেছে। তখন জামানকে তার অ্যাকাউন্টে ঢুকতে দেওয়া হবে। তাহলে ডেটাবেইস যারা দেখতে পায়, অথবা ডেটাবেইস হ্যাকার নিয়ে গেলেও জামানের পাসওয়ার্ড গোপনই থাকছে।

আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন, ব্লক চেইনে মার্কেল-ট্রি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। একটি ব্লকের মধ্যে আরেকটি ব্লকের হ্যাশ রাখা হচ্ছে। শুধু প্রান্তিক ব্লকে অন্য কোনো ব্লকের হ্যাশ থাকছে না। এর ফলে একটা নির্দিষ্ট লেনদেন কোন ব্লকে লিপিবদ্ধ আছে, তা অনেক দ্রুত খুঁজে বের করা সম্ভব হয়।

ব্যাংক খাতে আরও দক্ষতা ও স্বচ্ছতা আনয়নে ব্লকচেইন প্রযুক্তির যথেষ্ট প্রতিশ্রুতি আছে বলে দাবি করে আসছেন প্রযুক্তিবিদরা। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রিয়েল-টাইম আন্তঃসীমান্ত লেনদেন সম্ভব হচ্ছে এবং তথ্য-প্রবাহের গতিতেই অর্থ-প্রবাহ সম্ভব হচ্ছে।

স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ডিজিটালাইজেশন এন্ড ক্লায়েন্ট এক্সেসের বৈশ্বিক প্রধান গৌতম জৈন বলেছেন, “ব্লকচেইনে ব্যাংকগুলোকে নেতৃত্ব দিতে হবে। কারণ আপনি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকে তাকালে দেখবেন, এগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বৈশ্বিক গোষ্ঠীগুলোকে লেনদেনে সংযুক্ত করতে এবং ব্যবসা ও বাণিজ্যকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। প্রথমবারের মতো ব্যাংক খাত বৈশ্বিক পরিসরে এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য এমন এমটা টুল পেয়েছে যা নিরাপদ এবং অকাট্য।”

ব্যাংক খাতে ব্লকচেইনের ব্যবহার

১. দ্রুত পেমেন্ট

ব্লকচেইনের বিস্তৃত চ্যানেল ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো কম প্রসেসিং ফিতে আরও দ্রুত অর্থ পরিশোধ করার সক্ষমতা অর্জন করছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো নতুন সেবা বাজারে আনতে পারে যেখানে অর্থ প্রেরণ ব্যবস্থা আরও বেশি নিরাপদ এবং দ্রুততর কিন্তু ব্যয় কম। এর মধ্যমে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো উদ্ভাবনী ফিনটেক স্টার্টআপগুলোর (ফ্লাইওয়ার, রেমিটলি, বিকাশ ইত্যাদি) সঙ্গে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।

ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তৃতীয় পক্ষের ভেরিফিকেশন ছাড়াই সরাসরি লেনদেন করতে পারবে। এতে ব্যাংকের লেনদেনের প্রসেসিং টাইম প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের তুলনায় কমে আসবে। ২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান পেমেন্ট কাউন্সিলের ৯০ ভাগ সদস্য মত দিয়েছে, ব্লকচেইন ২০২৫ সাল নাগাদ ব্যাংক খাতে মৌলিক পরিবর্তন আনবে।

২. তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্ততা ছাড়াই ক্লিয়ারেন্স ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা

ব্লকচেইনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ট্রানজেকশন সরাসরি সম্পন্ন করতে সক্ষম এবং সুইফটের মতো বিদ্যমান প্রটোকলের চেয়ে আরও ভালোভাবে প্রতিটি লেনদেন ট্র্যাক করতে সক্ষম। প্রচলিত আন্তর্জাতিক লেনদেন কয়েকদিন সময় নেয় কিন্তু ব্লকচেইনে রিয়েলটাইম আন্তর্জাতিক লেনদেন সম্ভব হচ্ছে।

কেউ যদি বাংলাদেশের কোনও ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কারও কাছে অর্থ প্রেরণ করতে চায়, তবে সেই স্থানান্তরটি সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাঙ্ক ফিনান্সিয়াল কমিউনিকেশনসের (সুইফট) মাধ্যমে কার্যকর করা হবে। এই সুইট প্রোটোকল ব্যবস্থা কেবল পেমেন্ট অর্ডার প্রসেস করে। প্রকৃত অর্থ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই ট্রানজেকশন সম্পন্ন হয়। এতে একদিকে যেমন বাড়তি ব্যয় হয় অন্যদিকে সময়ও বেশি নেয়। অন্যদিকে ব্লকচেইনের মতো প্রযুক্তি ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি লেনদেনের ওপর প্রকাশ্যে স্বচ্ছতার সঙ্গে নজরদারি করতে সক্ষম করে তোলে। এক্ষেত্রে ব্যাংককে সুইফটের মতো কারও ওপর নির্ভর করতে হবে না। একটি পাবলিক ব্লকচেইনের মাধ্যমে ব্যাংক সরাসরি লেনদেন নিষ্পত্তি করতে পারে এবং পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে অর্থ প্রেরণ করতে পারে।

৩. অ্যাসেট ক্রয় বিক্রয়

ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে অ্যাসেট (স্টক, ডেবট কিংবা পণ্য) ক্রয়-বিক্রয়ে মধ্যস্তাকারীর প্রয়োজন হয়না। মধ্যস্তাকারীদের সরিয়ে দিয়ে ব্লকচেইন অ্যাসেট এক্সচেঞ্জ ফি কমিয়ে আনে এবং এর মাধ্যমে প্রচলিত সিকিউরিটিজ মার্কেটের অস্থিরতাও কমিয়ে আনতে সক্ষম। প্রযুক্তি গবেষকরা বলেছেন, সিকিউরিটিজগুলো ব্লকচেইনে প্লাটফর্মে গেলে বছরে বিশ্বব্যাপী ১৭ থেকে ২৪ মিলিয়ন ডলার খরচ বাঁচানো সম্ভব।

ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেটগুলো স্টক, পণ্য কিংবা ডেবট ক্রয়-বিক্রয় সম্পাদন করে এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার, ক্লিয়ারিং হাউজ, সেন্ট্রাল ডিপজিটরি এবং জিম্মাদার ব্যাংকগুলোর একটি জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এই সিস্টেমের গতিই শুধু কম নয়, এখানে ভুল হওয়ারও সুযোগ রয়েছে। এই ধরনের ট্রানজেকশন সম্পন্ন করা জটিল, কারণ বেশিরভাগ সময় ক্রেতা এবং বিক্রেতা একই জিম্মাদার ব্যাংকের ওপর আস্থা রাখেনা; এমনকি অনেক নির্ভরযোগ্য তৃতীয় পক্ষের ওপরও আস্থা রাখেনা যাদের কাছে তাদের সকল ডকুমেন্টস থাকবে।

যদি আপনি অ্যাসেট ক্রয় বা বিক্রয় করেন, এই অর্ডার কয়েকটি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। যে কারণে মালিকানা হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি জটিল। প্রতিটি তৃতীয় পক্ষই আপনার ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য তাদের খতিয়ানে টুকে রাখছে। এই প্রক্রিয়াটি শুধু অদক্ষই না, অনর্থকও। ব্লকচেইন প্রযুক্তি এই সমস্যার সমাধান করে ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেটে বিপ্লব ঘটাবে সক্ষম। মধ্যস্তাকারীদের সরিয়ে দিয়ে অ্যাসেট বিনিময়ে ব্যয় ও সময় কমিয়ে আনতে সক্ষম এই প্রযুক্তি।

বর্তমানে জার্মান সরকার এক্ষেত্রে তাদের ব্যাংকগুলোকে ক্রিপ্টোকারেন্সিনির্ভর সেবাদানের অনুমতি দিচ্ছে। ইউক্রেনও এই পথ অনুসরণ করছে।

৪. তহবিল সংগ্রহ

প্রচলিত ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করা বেশ জটিল প্রক্রিয়া। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটে থাকে যে, উদ্যোক্তারা বিনিয়োগকারীদের ডেকে আনে, অসংখ্য মিটিং করে, ব্যবসায়ের ভ্যালুয়েশন এবং ইকুয়িটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করে, এবং শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই এই দীর্ঘ আলোচনা ব্যর্থ হয়।

ব্লকচেইন কোম্পানিগুলো কয়েকটি বিকল্প মাধ্যমে এই তহবিল সংগ্রহের প্রক্রিয়াটিকে সহজ ও দ্রুততর করেছে। এরমধ্যে রয়েছে ইনিশিয়াল এক্সচেঞ্জ অফারিংস (আইইও), ইক্যুইটি টোকেন অফারিংস (ইটিও), এবং সিকিউরিটি টোকেন অফারিংস (এসটিও)। আইনগতভাবে সুরক্ষিত থাকার কারণে এসটিও বর্তমানে সর্বাধিক জনপ্রিয় বিকল্প। এই মডেলের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করতে একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে উত্তীর্ণ হতে হবে। সুইজারল্যান্ড ও মাল্টা এই এসটিও মডেল সবার আগে বাস্তবায়ন করেছে। বর্তমানে সর্বাধিক জনপ্রিয় ইটিও ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে নিওফান্ড।

৫. ক্রেডিট ও লোন

প্রথাগত ব্যাংকগুলো ক্রেডিট রিপোর্টিং পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করে। ব্লকচেইনের মাধ্যমে পিয়ার টু পিয়ার ভিত্তিতে ঋণ বিতরণ সম্ভব হবে যা হবে দ্রুততর এবং আরও বেশি নিরাপদ। এমনকি সিন্ডিকেট ঋণ কিংবা মর্টগেজের মত জটিল বিষয়ও ব্লকচেইনের মাধ্যমে আরও সহজ ও দ্রুততর করা সম্ভব।

ব্যাংকগুলো ঋণ আবেদনের ক্ষেত্রে ক্রেডিট স্কোর, বাড়ি বা জমির মালিকানা কিংবা আয় ও দায়ের অনুপাত দেখে ঝুঁকির মূল্যায়ন করে। এসব তথ্য পেতে ব্যাংকগুলোকে বিশেষায়িত ক্রেডিট এজেন্সির স্বরণাপন্ন হতে হয়। অন্যদিকে ব্লকচেইন যেহেতু পিয়ার টু পিয়ার ভিত্তিতে কাজ করে তাই এসব তথ্যের জন্য তাকে অন্য কারো স্বরণাপন্ন হতে হয় না। যে কারণে কাজের গতি অনেক বৃদ্ধি পায়।

৬. ট্রেড ফিন্যান্স

ব্যাংকিংয়ের অন্য যে ক্ষেত্রে ব্লকচেইন বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে সেটা হলো ট্রেড ফিন্যান্স। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্যবসায়ের সঙ্গে সংযুক্ত সকল অর্থায়নই ট্রেড ফিন্যান্সের অন্তর্ভূক্ত। আজও ট্রেড ফিন্যান্সের অনেক কার্যক্রম ইনভয়েস, লেটার অব ক্রেডিট কিংবা বিলের মতো কাগজপত্রের ওপর নির্ভরশীল। অনেক প্রতিষ্ঠান এই কাজগুলো অনলাইনে সম্পন্ন করলেও কাজ শেষ করতে অনেক সময় নেয়।

ব্লকচেইন-ভিত্তিক ট্রেড ফিন্যান্স এসব ম্যানুয়াল প্রসেস, পেপারওয়ার্ক ও বুরোক্রেসি থেকে মুক্তি দিয়ে কাজের গতিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। কিভাবে গতি বাড়ে তা নিচের উদাহরণে স্পষ্ট হবে।

প্রথাগত ট্রেড ফিন্যান্স ব্যবস্থায় লেনদেন-সংক্রান্ত প্রমাণের জন্য অংশগ্রহণকারী সকল পক্ষকেই নিজ নিজ ডেটাবেজ সংরক্ষণ করতে হয়। এসব তথ্য প্রতিবারেই একটির সঙ্গে আরেকটি মিলিয়ে দেখতে হয়। একটি ডকুমেন্টের সামান্য একটি ভুল অন্য ডেটাবেজের নথিতে অনুলিপি হয়ে যেতে পারে।

এখানে ব্লকচেইন কিভাবে সহায়তা করে? ব্লকচেইনে একই ডকুমেন্টের একাধিক কপি সংরক্ষণ করার কোন প্রয়োজন নেই। এটা এ কারণে যে, সকল তথ্য একটি ডিজিটাল ডকুমেন্টের ভেতরে একীভূত করা সম্ভব যা রিলেয় টাইমে আপডেট হয়ে যায় এবং নেটওয়ার্কের সকল সদস্যই প্রবেশাধিকার পায়। এ কারণে রিয়েল টাইম সুবিধায় আন্তর্জাতিক ট্রেড ফিন্যান্স কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

৭. পরিচয় সনাক্তকরণে ব্লকচেইন

পরিচয় সনাক্তকরণ ছাড়া ব্যাংকের পক্ষে কোন অনলাইন লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু পরিচয় সনাক্তকরণে অনেকগুলো ধাপ পার হতে হয় যা গ্রাহক অপছন্দ করে। নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যাংকের প্রতিটি সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রেই এই একই বিষয়ের মুখোমুখি হতে হয়।

ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে এই শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার গতি দ্রুততর করে গ্রাহক ও ব্যাংকগুলো সুবিধা পেতে পারে। এর কারণ হল, এই প্রযুক্তিতে একবার আইডেনটিটি ভেরিফিকেশন হলেই সকল সেবার ক্ষেত্রে এই ভেরিফিকেশন সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে পুনঃব্যবহার করা যায়। অর্থাত্, বার বার ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন পরে না।

গ্রাহক কিভাবে নিজেদের পরিচয় করিয়ে দেবে এবং কাদের সঙ্গে তার পরিচয় শেয়ার করবে— ব্লকচেইনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তা নির্ধারণ করে দিতে সক্ষম হবে। ব্লকচেইনে তাদের পরিচয় মাত্র একবারই নিবন্ধন করতে হবে। প্রতিটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য তাকে আর দ্বিতীয়বার রেজিস্ট্রেশন করতে হবে না যতক্ষণ সেই সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্লকচেইন প্লাটফর্মে রয়েছে। এই প্রযুক্তির বৈশিষ্টগত কারণেই এখানে সংরক্ষিত ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে।

৮. অ্যাকাউন্টিং এবং অডিটিংয়ের জন্য ব্লকচেইন

যে হারে সবক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশন হয়েছে সে হারে অ্যাকাউন্টিং ডিজিটাইজেশন হয়নি। এর পেছনের অন্যতম কারণ হল, ডেটার বিশুদ্ধতা ও বৈধতার বিষয়ে এখানে কঠোরভাবে রেগুলেটরি বিধিবিধান পরিপালন করতে হয়। যে কারণে এ্যাকাউন্টিং হচ্ছে অন্যতম একটি ক্ষেত্র যেটিকে ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে রূপান্তরিত করা সম্ভব।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, ব্লকচেইন অ্যাকাউন্টিং ও অডিটিংয়ের কমপ্লায়েন্সকে সহজ করবে। লেনদেন প্রাপ্তির উপর ভিত্তি করে পৃথক রেকর্ড রাখার পরিবর্তে সরাসরি একটি জয়েন্ট রেজিস্টারে লেনদেন যুক্ত করতে পারে এই প্রযুক্তি। এই রেজিস্টারের সকল তথ্য ডিস্ট্রিবিউটেড থাকবে। এতে করে রেকর্ডগুলো আরও বেশি স্বচ্ছ ও নিরাপদ থাকবে। এক্ষেত্রে ব্লকচেইন একটি ডিজিটাল নোটারি হিসেবে কাজ করতে পারবে যা সকল লেনদেন ভেরিফাই করবে। চালানের অর্থ সয়ংক্রিয়ভাবে পরিশোধের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি সমানভাবে পারদর্শী।

৯. পিয়ার-টু-পিয়ার (পিটুপি) ট্রান্সফার্স

পিটুপি ব্যবস্থায় গ্রাহক তার ব্যাংক এ্যাকাউন্ট কিংবা ক্রেডিট কার্ড থেকে অনলাইনের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির কাছে ফান্ড ট্রান্সফারের সুযোগ পায়। বর্তমানে বাজারে অনেকগুলো পিটুপি ট্রান্সফার এ্যাপ্লিকেশন রয়েছে। তবে সবগুলোরই কোন না কোন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কিছু এ্যাপ্লিকেশন আছে যেগুলো বিশ্বের সব স্থানে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ দেয় না; কিছু নির্দিষ্ট স্থানে অর্থ প্রেরণের সুযোগ দেয়। আবার কিছু আছে যেগুলো একই দেশের মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ দেয়না। অন্যদিকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বেশি কমিশন ফি নেয়। কিন্তু গ্রাহকের সংবেদনশীল তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট নিরাপদ নয় বলে মনে করা হয়।

এই সকল সমস্যাই ব্লকচেইনের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। এই প্রযুক্তি পিয়ার টু পিয়ার ট্রান্সফারের জন্য অ্যাপ্লিকেশনগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণে সহায়তা করবে। ব্লক চেইনের কোন ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা নেই। সারা পৃথিবীর মধ্যে পিটুপি ট্রান্সফার করতে সক্ষম। এর ওপরে, ব্লকচেইন ভিত্তিক লেনদেন রিয়েল-টাইম ভিত্তিক। প্রাপককে তিন-চারদিন বসে থাকতে হবে না অর্থ পাওয়ার জন্য, সঙ্গে সঙ্গেই সে পেয়ে যাবে।

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবু ধাবি কমার্শিয়াল ব্যাংক আন্তঃসীমান্ত এলসি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সঙ্গে। কানাডা থেকে বাংলাদেশে রফতানি করা সাড়ে ৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যের গমের এলসি গ্রহণ করে ইসলামী ব্যাংক। (সূত্র: আইএফএনফিনটেক)

বাংলাদেশে আর্থিক খাতের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ফাইন্যান্স প্লাটফর্ম চালু করে আইপিডিসি। ২০১৯ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটি ‘অর্জন’ নামে দেশের প্রথম ব্লকচেইনভিত্তিক ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স প্ল্যাটফর্ম চালু করে। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, ‘অর্জন’ একটি বিস্তৃত সাপ্লাই চেইন আর্থিক সেবা, যেখানে থাকছে সহজে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার মাধ্যমে ফ্যাক্টরিং, রিভার্স ফ্যাক্টরিং, ওয়ার্ক অর্ডার এবং ডিস্ট্রিবিউটর ফাইন্যান্সিং। ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন প্ল্যাটফর্মের উন্নতির মাধ্যমে ক্ষুদ্র এন্টারপ্রাইজগুলোকে সহজে ও স্বল্প খরচে ঋণ সুবিধা দেওয়া, সামগ্রিক সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং ইকো-সিস্টেম তৈরি করাই ‘অর্জন’-এর লক্ষ্য। (সূত্র: বিডিনিউজ)

২০২০ সালের ১৬ আগস্ট ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে এলসি সুবিধা চালু করে স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। ওইদিন তারা এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিয়েলাটেক্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের এলসি খোলে। ২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে এই সেবা চালু করে এইচএসবিসি। ওইদিন ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেডের অনুকূলে ২০ হাজার টন জ্বালানি আমদানির জন্য আন্তঃসীমান্ত ঋণপত্র খোলে এইচএসবিসি। ঋণপত্র খোলার পর ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল, যেখানে আগে একটি এলসি খুলতে ৫ থেকে ১০ দিন সময় লাগত, সেখানে নতুন প্রযুক্তিতে ২৪ ঘণ্টারও কম সময় লেগেছে। (সূত্র: বিডিনিউজ ও দি ওয়াশিংটন নিউজডে)

২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশে প্রথমবারের মত ব্লকচেইনভিত্তিক রেমিট্যান্স সেবা চালু করে স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও বিকাশ। এর মাধ্যমে অল্প খরচে ও নিরাপদে মালয়েশিয়া থেকে মোবাইল ওয়ালেট ব্যবহার করে তাত্ক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন প্রবাসীরা। (সূত্র: সমকাল) ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ব্লকচেইনের মাধ্যমে এলসি সুবিধা চালু করে প্রাইম ব্যাংক। (সূত্র: বিজনেস স্টান্ডার্ড)

দি সিটি ব্যাংক ২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত এলসি সেবা চালু করেছে। ওইদিন সিটি ব্যাংক বিশ্বের প্রথম ব্যাংক হিসেবে শরিয়াহ্ ভিত্তিক ব্লকচেইন প্লাটফর্মে এলসি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। ব্যাংকটি প্রথম যে ঋণপত্রটি খুলেছিল তার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে মাত্র ৩৮ মিনিট সময় লেগেছিল। (সূত্র: ডেইলি স্টার)

ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে প্রথম মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসেবে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ যাত্রা শুরু করে ‘উপায়’। ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে এখানে গ্রাহকদের টাকা হ্যাক হওয়ার কোন সুযোগ নেই। (সূত্র: ভোরের কাগজ)

বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২০২০ সালের ১১ মার্চ থেকে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির সার্টিফিকেটের নিরাপত্তা এমনভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে অন্য কেউ তা পাল্টাতে না পারে এবং নকল সার্টিফিকেট যাতে ইস্যু করতে না পারে। (সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)

কি বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ব্লকচেইনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে একটি গোলটেবিল আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)। গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছিলেন বিআইবিএমের চেয়ার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. বরকত-এ-খোদা। তিনি নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকিংয়ে ব্লকচেইন ব্যবহারে গুরুত্বারোপ করে বলেছিলেন, ব্যাংকাররা ব্লকচেইন প্রযুক্তি আত্মস্ত করতে না পারলে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত পিছিয়ে পড়বে। বিআইবিএম এর ওই আলোচনা সভা থেকে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহারে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসার সুপারিশ করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও ভূমিকা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। (সূত্র: বাংলাট্রিবিউন)

ব্যাংক খাতে ব্লকচেইনের ভবিষ্যৎ

ব্যাংক নির্বাহীরা বিশ্বাস করেন, ব্লকচেইন প্রযুক্তিকে ব্যাংক খাতের প্রধান প্লাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে তাকে আরও কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। ব্যাংকগুলিকে প্রথমে ম্যাচিং সলিউশন ব্যবহার করে ব্লকচেইন প্রযুক্তির বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনীয় অবাকাঠামো ছাড়াই এই প্রযুক্তির ব্যপক ব্যবহার ব্লকচেইনের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিতে পারে।

ব্লকচেইনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করা হলে তা ব্যাংক ও গ্রাহক— উভয়ের জন্য ভাল ফল নিয়ে আসবে বলেই বিশেষজ্ঞরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছেন। আর্থিক খাতে ব্লকচেইন সম্পূর্ণরূপে গৃহীত হয়ে গেলে লেনদেনের সময় ও ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি আরও নির্ভুল ও নিরাপদ ব্যাংকিং করা সম্ভব হবে। বনিক বার্তা।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button