দেশের ব্যাংকগুলো পূবালী থেকে শিক্ষা নিতে পারে: শফিউল আলম খান চৌধুরী

শফিউল আলম খান চৌধুরী। ১৯৮৩ সালে পূবালী ব্যাংকের শিক্ষানবিশ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে শুরু হয় তার কর্মজীবন। সেই থেকে আছেন টানা ৩৯ বছর। প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকটির এমডির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। আগামীকাল দক্ষ এ ব্যাংকারের শেষ কর্মদিবস। শৈশব, কৈশোর, শিক্ষা ও কর্মজীবনের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাছান আদনান।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

আপনার শৈশব, কৈশোর সম্পর্কে জানতে চাই?

নেত্রকোনার ভাটি অঞ্চলে আমার জন্ম। গ্রামের নাম গোবিন্দশ্রী। এটি মদন উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা। অজপাড়াগাঁ বলতে যা বোঝায়, সে রকমই একটি জনপদ। চতুর্দিকে পানি, তার মধ্যে দ্বীপের মতো এক টুকরো ভূমি। বছরের অন্তত ছয় মাস পানিবন্দি জীবন। পানি থাকলে নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। শুকনো মৌসুমে ১২ মাইল হেঁটে গাড়িতে উঠতে হতো। এ রকমই একটি অবহেলিত জনপদে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছি। তবে জন্মসূত্রে সমৃদ্ধ একটি পরিবার পেয়েছিলাম। আজকের অবস্থানে আসার পেছনে নিয়ামক ছিল সেটি।

আমাদের বাড়িতেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা সেখানেই। মাধ্যমিকে ভর্তি হয়ে কিশোরগঞ্জ শহরে বসবাস শুরু হয়। আমার আব্বা ফয়েজুর রহমান খান চৌধুরী সেই শহরে একটি বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ঢাকায় আসি। ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে পূবালী ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু হয়। দীর্ঘ ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে আমি সব সময়ই গ্রামীণ অর্থনীতির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলাম। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির পাশে থাকার চেষ্টা করেছি।

টানা ৩৯ বছর পূবালী ব্যাংকেই কাটালেন। কর্মজীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে আপনার অনুভূতি কী?

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষানবিশ সিনিয়র অফিসার পদে পূবালী ব্যাংকে যোগ দিই। বলতে পারেন এটিই আমার একমাত্র চাকরির পরীক্ষা। বন্ধু-বান্ধবদের অনেকে পূবালীসহ অনেক ব্যাংকে চাকরিজীবন শুরু করেছিল। অবসরের আগ পর্যন্ত অনেকে পাঁচ-সাতটি ব্যাংক পরিবর্তন করেছে। কিন্তু আমি পূবালীকেই ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম। বেশি বেতন ও উঁচু পদমর্যাদায় অনেক ব্যাংক থেকে চাকরির প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু সেসবে কখনো আগ্রহ দেখাইনি।

আমার মতো অনেকেই আছেন, পূবালী ব্যাংকে চাকরি শুরু করে এখান থেকেই অবসরে গিয়েছেন। চাকরিজীবনের শুরু ও শেষ একই প্রতিষ্ঠানে হওয়াটি অন্য রকম অনুভূতির। আমার জন্য বাড়তি পাওয়া হলো, ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন। আর শীর্ষ নির্বাহী নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে পূবালী ব্যাংক পর্ষদ নিজ কর্মীদের ওপরই আস্থা রাখছেন। এটি যেকোনো ব্যাংকের পূর্ণতার সাক্ষ্য দেয়। দেশের প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে পূবালী সুনামের সঙ্গে গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে।

চাকরিজীবনে প্রথম ২৫ বছর ব্র্যাঞ্চ ব্যাংকিং করেছি। ১৯৮৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পূবালী ব্যাংকের ১০টি শাখার ব্যবস্থাপক ছিলাম। কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজার শাখা থেকে ব্যবস্থাপক পদে দায়িত্ব পালন শুরু হয়েছিল। সর্বশেষ রাজধানীর মতিঝিল করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক ছিলাম। দীর্ঘ এ সময়ে কোনো কালিমা গায়ে লাগেনি। গ্রাহক কিংবা ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। চাকরি জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পূবালী ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব নিই। সততা, আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গেই এ দায়িত্ব পালন করেছি। তাই দীর্ঘ এ ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে কোনো অপ্রাপ্তি নেই।

শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে পূবালী ব্যাংককে কোথায় রেখে যাচ্ছেন?

পূবালী দেশের প্রাচীনতম ব্যাংকগুলোর একটি। ১৯৫৯ সালে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড নামে এটির যাত্রা। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কিছু বাঙালি উদ্যোক্তার উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পূবালী ব্যাংক। ১৯৮৩ সালে এ ব্যাংকটিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। পূবালী এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি। সম্পদের গুণগত মানের দিক থেকে এ ব্যাংকের অবস্থান সুদৃঢ়। আমাদের কাছে আছে গ্রাহকদের ৫০ হাজার ২৮১ কোটি টাকার আমানত। পূবালী ব্যাংকে ২০ লাখ ১০ হাজারের বেশি আমানতকারীর ব্যাংক হিসাব রয়েছে। ৪২ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকার ঋণ আমরা বিতরণ করেছি। আমাদের ব্যাংকের বর্তমান ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি। মূলধনসহ পূবালী এখন প্রায় ৬৯ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক। গত কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবেই উন্নতি করেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সারা দেশে আমাদের ৪৯০টি শাখা রয়েছে। দেশে অন্য কোনো বেসরকারি ব্যাংকের এত শাখা নেই।

পূবালী ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানতে চাই?

করপোরেটের পাশাপাশি দেশের কৃষি, এসএমই ও রিটেইল খাতে পূবালী ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়ছে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আমাদের ঋণ পোর্টফোলিওর ২০ শতাংশ ছিল এসএমই খাতে। এ খাতে ৮ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। কৃষি খাতে বিতরণ হয়েছে ৯৫০ কোটি টাকার ঋণ। রিটেইলেও ৩ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার বিনিয়োগ আমাদের রয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়িতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে পূবালী ব্যাংকের অবস্থান সবার ওপরে। গত কয়েক বছর আমরা করপোরেটের চেয়ে এসএমই, রিটেইল ও কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে বেশি জোর দিয়েছি। অনেক পুরনো ব্যাংক হওয়া সত্ত্বেও পূবালীর খেলাপি ঋণের হার খুবই কম। গত আগস্ট শেষে আমাদের খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

দেশের ব্যাংকগুলোর গ্রামীণ শাখা কেবল আমানত সংগ্রহের কাজে ব্যবহার হচ্ছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কথা বলে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করা হলেও এর প্রকৃত সুফল থেকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বঞ্চিত। এ বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কী?

আমরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে যেভাবে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আবেগ প্রকাশ করি, বাস্তবতা তার থেকে ভিন্ন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্যাংকিংয়ের প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। আমি দেশের পিছিয়ে পড়া জনপদ থেকে উঠে এসেছি। তাই দেখেছি, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কীভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়ছে। দেশের ব্যাংকিং কাঠামো গড়েই উঠেছে ধনিক শ্রেণীর তোষণে। তবে ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে দেয়ার সময় এসেছে। কিছু ব্যাংক এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। পূবালী ব্যাংক এক্ষেত্রে অগ্রগামী। আমার জন্মস্থানের অন্তত ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ব্যাংকের কোনো শাখা ছিল না। এক বছর আগে আমি আমার গ্রামে পূবালী ব্যাংকের একটি উপশাখা চালু করেছি। এজন্য পূবালী ব্যাংক পর্ষদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। গ্রামীণ ওই উপশাখায় বর্তমানে ৬ কোটি টাকার আমানত জমা হয়েছে। আমি বলেছি, সংগৃহীত আমানত ওই উপশাখার অধীনে ঋণ বিতরণ করতে। এভাবে দেশের অন্যান্য গ্রামীণ শাখা ও উপশাখাকেও আমরা ঋণ বিতরণ জোরদার করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি।

৩৯ বছর চাকরি করছেন। দীর্ঘ এ সময়ের অভিজ্ঞতায় পূবালী ব্যাংক পর্ষদ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

২৫ বছর ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক ছিলাম। দীর্ঘ এ সময়ে ব্যাংকের পর্ষদ থেকে অনৈতিক কোনো চাপ কিংবা প্রস্তাব পাইনি। ২০১০ সাল থেকে ব্যাংক পর্ষদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। শীর্ষ নির্বাহী হিসেবেও প্রায় দুই বছরের দায়িত্ব পালন শেষ করলাম। এ সময়ে পর্ষদের পক্ষ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছি। পূবালী ব্যাংক পর্ষদ প্রবীণ-নবীনের সংমিশ্রণে দেশের নাম্বার ওয়ান পর্ষদ। দেশের অন্য ব্যাংকগুলো এ ব্যাংকের পর্ষদ থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

আরও দেখুন: এনআরবিসি ব্যাংক ছয় ক্যাটাগরিতে দক্ষিণ এশিয়ার বেস্ট ব্যাংক পুরস্কারে ভূষিত

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button