লোকসান সমন্বয় করতে ব্যয় সঙ্কোচনে নামছে ব্যাংক

0

ব্যয় সঙ্কোচনের নীতিতে নামছে ব্যাংকগুলো। করোনা-পরবর্তী মন্দায় লোকসানের ধকল সামাল দিতে ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলো বিভিন্ন ধরনের ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ভাতা কমানো, স্বাভাবিক অবসরে যাওয়া লোকবলের বিপরীতে নতুন জনবল নিয়োগ না দেয়া, বিদ্যমান জনবল দিয়ে বাড়তি কাজ করানো, প্রয়োজনে বাড়তি লোকবল কমানোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে।

দেশের তৃতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ ধরে তিনি একই ব্যাংকে কর্মরত আছেন। অত্যন্ত সুনামের সাথে ব্যাংকিং করায় গত তিন বছর ধরে একটানা বিভিন্ন শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু হঠাৎ করে প্রধান কার্যালয় থেকে তাকে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন মহলের সাথে যোগাযোগ করলে জানা যায়, তার মতো আরো প্রায় ১২ জন শাখা ব্যবস্থাপককে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বলা হয়েছে।

করোনাভাইরাসের কারণে বেশির ভাগ ব্যাংক সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং করছে। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়গুলোতেও আগের মতো কাজ হচ্ছে না। ফলে এ সময়ে তিনি কোথায় যাবেন। কী করবেন এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

ওই ব্যাংকারের মতো আরো অনেক ভালো ব্যাংকারই চাকরি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কারণ হিসেবে, আরেক ব্যাংকার জানান, কারণ কিছুই না, কর্তৃপক্ষ ব্যয় কমাতে চাচ্ছে। করোনার কারণে দেশের অর্থনৈতিক মন্দায় যে লোকসান হবে তার ধকল কাটাতেই মাঝারি মানের কর্মকর্তাদের ওপর প্রথম নজর পড়েছে। যেখানে শাখার সহ-ব্যবস্থাপক দিয়ে পরিচালনা করা যাবে, সেখানে শাখা ব্যবস্থাপককে বাদ দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বিকল্প জনবল থাকলেই বেশি বেতনের জনবলকে বাদ দেয়ার পরিকল্পনা করছে বেশির ভাগ ব্যাংক।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, করোনার কারণে ব্যাংকগুলোর লেনদেন সীমিত হয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ ব্যাংকেরই এখনই লোকসান গুনতে হচ্ছে। যেখানে একটি মাঝারি মানের ব্যাংকের শুধু মাসে বেতনভাতাই আসে ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমানে বেশির ভাগ ব্যাংকেরই মাসে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার ওপরে মুনাফা হচ্ছে না। অর্থাৎ পরিচালন ব্যয় নির্বাহের জন্য আয় হচ্ছে না।
একটি ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, শুধু করোনাভাইরাসের কারণেই নয়, নানা কারণে ব্যাংকগুলোর ওপর লোকসানের বোঝা চেপেছে।

যেমন, চলতি অর্থবছরের ১ মার্চ থেকে ঋণের সুদহার বাধ্যতামূলকভাবে ৯ শতাংশ কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু ৮ শতাংশেও কোনো কোনো ব্যাংক আমানত পাচ্ছে না। তাহলে তাদের মুনাফা হবে কিভাবে। দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, গত এপ্রিলে তাদের ব্যাংকের মুনাফা ৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। যেখানে প্রতি মাসেই তাদের মুনাফা ২০ কোটি টাকার ওপরে হতো।

ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর করায় ব্যাংকগুলো এমনিতেই ভয়াবহ চাপে ছিল, এর ওপর ২ মাসের সুদ স্থগিত করায় আরো চাপে পড়ে গেছে ব্যাংকগুলো। তবে, কিছু কিছু ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা এ জন্য স্বস্তিতে আছেন। কারণ, এ জন্য পরিচালনা পর্ষদের চাপ তাদের ওপর থেকে কমে গেছে। তারা এখন সহজেই বলতে পারবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের কারণে, অর্থাৎ ২ মাসের সুদ-আয় স্থগিত রাখার কারণে মুনাফা কমে গেছে। কিন্তু আখেরে রক্ষা হবে না।

ব্যাংকগুলোর ওপর ভেতরের ও বাইরের চাপের কারণে পরিচালন আয় কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন অপর একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী। তিনি জানান, বর্তমান পরিস্থিতিই জানান দিচ্ছে ব্যাংকগুলো কতটুকু চাপে থাকবে। একে তো ব্যাংকের ঋণ আদায় হচ্ছে না। এর ওপর আগে থেকেই কিছু বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ ঋণ নিয়ে তা ফেরত দিচ্ছেন না। সব মিলেই ব্যাংকগুলোর এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা লেগে গেছে। এ কারণে শুধু জনবল কমিয়ে ও বিভিন্ন ভাতা কমিয়ে লোকসান সমন্বয় করা দুষ্কর হবে। এ জন্য দরকার যারা আগে ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না, যারা ঋণ নিয়ে পাচার করে দিয়েছে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তবেই ব্যাংকিং খাতের ওপর থেকে বিপদ মুক্ত হবে। -নয়া দিগন্ত।

Leave a Reply