বেসরকারি ব্যাংকে কর্মজীবন শুরুর আগে যে বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার

0
1156

২০০৬ সালে যখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে কর্মজীবন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, আমার বন্ধুদের মতো আমিও সরকারি চাকরির তুলনায় বেসরকারির কথাই বেশি ভেবেছি। সরকারি চাকরি, কম বেতন, যেখানে-সেখানে বদলি, অবৈধ আয়ের প্রশ্ন—এসব ভাবনা ছাড়াও কেউ কেউ বলতেন, ‘পাশের কলিগ পান খেয়ে পিক ফেলল, তোর জামায় একটু লেগে গেল, কী করবি?’ এমন আরো কিছু অদ্ভুত এবং অপরিপক্ব ভাবনা আমাদের চাকরির সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রেখেছে।

প্রাইভেট ব্যাংককেই বেসরকারি চাকরির সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা ভেবে অনেকেই তুমুল প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বেসরকারি ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করেন। ভালো বেতন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাসহ পরিপাটি অফিস ইত্যাদি দেখে প্রথম কিছুদিন কেটে যায় ভালো করে কিছু বোঝার আগেই। সময় যেতে থাকে তার চিরায়ত নিয়মে। দুই-চার বছর যাওয়ার পর এই নব্য ব্যাংকারদের অনেকেই ভাবেন, ভুল হয়ে গেছে মনে হয়। কেউ কেউ অন্য বন্ধুদের সঙ্গে অন্য চাকরির পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েও যান। কিন্তু ভালো বেতন আর অন্যান্য সুবিধার যে ফাঁদ, তা থেকে বেরিয়ে যাওয়া সহজ নয়। এভাবে কয়েক বছর চলে যাওয়ার পর যারা ভাবলেন যে সঠিক পথেই আছেন, তাদের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যারা অনুভব করলেন যে ভুল হয়ে গেছে, তাদের আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সারা দিন অফিস করে বাসায় ফিরে নতুন করে চাকরির জন্য পড়ালেখা করা কঠিন কাজ। আর তার চেয়ে বড় কথা হলো, বয়স যে ত্রিশের সীমানা পেরিয়ে গেছে।

আমার জানামতে পরের গ্রুপের সদস্যই বেশি। তবে কেউ যে এ খাঁচা ভাঙতে পারেননি তা নয়। আমাদের সঙ্গের একজন, শিক্ষাজীবনে আমার মতো যার সবগুলোতেই প্রথম বিভাগ, তিনি ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে অর্ধেক বেতনে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং কিছুদিন পর ফুল স্কলারশিপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে চলে যান। যতটুকু জানি, তিনি সুখী এবং এখন তার পিএইচডি শেষের পথে। আবার এর ঠিক উল্টা উদাহরণও আছে। আমাদের সঙ্গের আরেকজন ব্যাংক ছেড়ে দিয়ে সিভিল সার্ভিসে চলে গেলেন, দু-তিন বছর পর আবার ব্যাংকে ফিরে এলেন সমসাময়িকদের নিচের পোস্টে। যারা ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করেন, একটা সময় পরে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পারেন না এবং সারা জীবন ফাঁদে পড়ার মতো কষ্ট নিয়ে পার করেন, তাদের মনঃকষ্টের কথা ভেবেই এ আলোচনা।

নতুন যারা কর্মজীবনে প্রবেশ করবেন এবং ব্যাংকিংকে পেশা হিসেবে নিতে চান, তাদের উদ্দেশে কিছু বিষয় উল্লেখ করতে চাই। যাতে উল্লিখিত ফাঁদে পড়ার মতো কষ্ট নিয়ে যাপিত জীবন কারো না হয় এবং প্রতিষ্ঠানও মনে প্রাণে ব্যাংকার হতে চান এমন অফিসার পায়। ব্যাংকে, বিশেষভাবে বেসরকারি ব্যাংকে কর্মজীবন শুরুর আগে যে বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার তা নিম্নরূপ।

প্রথমত, ব্যাংকারের কাজের পরিধি সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। অর্থাৎ কর্মজীবন শুরু করার পর থেকে অবসরে যাওয়া পর্যন্ত ব্যাংকারের কাজ কী, তার কিছুটা হলেও জানা দরকার। ব্যাংকের বাইরে থেকে আমরা ধারণা করি, ব্যাংকার টাকা জমা নেয়া ও প্রদান করা, হিসাব খোলা, বিনিয়োগ বা লোনের কাজ, এলসি ইত্যাদি করেন সারা দিন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে বসে বসে। কী আরাম! বাস্তবে দৃশ্যমান এ কাজ ব্যাংকারের কাজের অর্ধেক বা কোনো কোনো ব্যাংকে অর্ধেকেরও কম প্রকাশ করে। বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। ব্যাংকার কার টাকা জমা নেবেন, কাকে লোন দেবেন, কার এলসি করবেন? কেন গ্রাহকের! সহজ উত্তর। গ্রাহক ব্যাংকে আসবেন এবং ব্যাংকারের কাছে ওইসব সেবা চাইবেন আর ব্যাংকার হাসি মুখে সব সেবা দিয়ে দেবেন, ব্যস! কোনো এক সময়ে হয়তো এ উত্তরটাই সঠিক ছিল কিন্তু বর্তমানে বিষয়টা মোটেও এমন নয়। যেমন ধরা যাক, কোনো ব্যাংকে কোনো গ্রাহক এলেন না, তাহলে কী হবে? ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কোনো কাজ থাকবে না, কোনো আয় থাকবে না, ফলে ব্যাংক বন্ধ করে দিতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৬০টি ব্যাংক। ফলে কোনো একটি ব্যাংকে না গেলে গ্রাহকের খুব বেশি সমস্যা নেই। ফলে বর্তমানে ব্যাংক কর্মকর্তার অন্যতম প্রধান কাজ গ্রাহক নিয়ে আসা। ডিপোজিটও আনতে হবে, লোন গ্রাহকও আনতে হবে। তারপর সব নিয়মকানুন মেনে গ্রাহককে সেবা দিয়ে মুনাফা করতে হবে। মুনাফা করাই ব্যাংকারের প্রধান উদ্দেশ্য।

দ্বিতীয়ত, মুনাফা করাই যেহেতু প্রধান উদ্দেশ্য, তাই কী পরিমাণ মুনাফা করতে হবে তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ পরিমাণটা বোর্ড অর্থাৎ মালিকপক্ষ নির্ধারণ করে দেয়, যা সহজ ভাষায় টার্গেট নামে পরিচিত। ডিপোজিট, লোনসহ ব্যাংকের বিভিন্ন পণ্যের জন্য সবাইকে টার্গেট দেয়া হয় এবং ওই টার্গেটের ফল বছরান্তে সবার পারফরম্যান্স মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এন্ট্রি লেভেলের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রধান নির্বাহী পর্যন্ত সবাই এ টার্গেট নেন এবং সর্বোচ্চ অর্জনের চেষ্টা করেন। ফলে যারা টার্গেট ওরিয়েন্টেড কোনো কিছু ভয় পান অথবা পছন্দ করেন না, তাদের ব্যাংকার হওয়ার আগে আরেকবার ভেবে নিতে হবে, কারণ ব্যাংকারের সারা জীবন টার্গেটের সঙ্গেই কাটে।

তৃতীয়ত, চাকরির নিরাপত্তা বহুল আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রচলিত একটি কথা হলো, সরকারি চাকরিতে নিরাপত্তা অর্থাৎ জব সিকিউরিটি আছে কিন্তু বেসরকারি চাকরি যেকোনো সময় চলে যেতে পারে। এ কথা যথার্থই সত্য। নিয়মকানুন মেনে চললে এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকলে সরকারি চাকরি চলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু সব নিয়মকানুন যথারীতি মেনে চললেও বেসরকারি চাকরি না-ও থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠানই যদি না থাকে, তাহলে চাকরি থাকার কোনো সুযোগ নেই। আবার ব্যাংক টিকে থাকলেও ব্যাংকারের চাকরি চলে যেতে পারে বিভিন্ন কারণে। গ্রাহকের জালিয়াতি এবং নিজের বড় ধরনের ভুল বা গাফিলতির কারণে হারাতে হতে পারে চাকরি। বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি ব্যাংকারকে নিয়মিত নিতে হয়, যার কারণেও অফিস ছাড়া লাগতে পারে এমনকি জানামতে কোনো অপরাধ না করেও। তাছাড়া দিনের পর দিন প্রদত্ত টার্গেটের উল্লেখযোগ্য অর্জন না থাকলেও চাকরি করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। চাকরি চলে যাওয়ার কথাটা সহজে বলা গেলেও বাস্তব জীবনে মধ্যবয়সে, যখন ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছে, বয়স্ক মা-বাবা আছে এবং সংসার চালাতে প্রতি মাসে অর্থের জোগান অপরিহার্য, চাকরি চলে যাওয়াটা হঠাৎ অন্ধকার নেমে আসার মতো বিষয়।

চতুর্থত, ছাত্রজীবনের পড়ালেখা বিশেষ করে ব্যবসায় শিক্ষা থেকে আমরা জানি, যারা ঝুঁকি নিতে পছন্দ করেন (রিস্ক লাভার), তারা ব্যবসা করেন আর যারা অপছন্দ করেন বা এড়িয়ে চলেন (রিস্ক এভার্টার), তারা চাকরি করেন। ব্যাংকে চাকরি করার ক্ষেত্রে বিষয়টা অন্য রকম। অন্য যেকোনো ব্যবসার ক্ষেত্রে মালিকরাই ব্যবসা পরিচালনা করেন, অর্থাৎ কোত্থেকে কী কিনবেন, কী উৎপাদন হবে, কার কাছে বিক্রি হবে, নগদে নাকি বাকিতে বিক্রি ইত্যাদি বিষয় মালিকদের এখতিয়ার। কর্মচারীরা শুধু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। ফলে ঝুঁকির শতভাগ মালিকদের ওপর। কিন্তু ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব মালিকদের নয়। ডিপোজিট আনা এবং লোনের গ্রাহক নিয়ে আসা ব্যাংক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব। ব্যাংকের আয়ের প্রধান উৎস লোন দেয়া। লোন দেয়া এবং সুদ বা মুনাফাসহ ওই টাকা আদায় করার দায়িত্ব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অর্থাৎ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা এমডি থেকে শুরু করে সব অফিসারের। লোন দিতে না পারা হলো দুর্বল কর্মক্ষমতা আর দিয়ে আদায় না হলে অর্থাৎ খারাপ হয়ে গেলে ব্যর্থতার পাশাপাশি আরো বিষয় এগিয়ে আসে, যেমন গ্রাহকের সঙ্গে যোগসাজশে কিছু হয়েছে কিনা, কাজে গাফিলতি আছে কিনা ইত্যাদি। আমার এক আত্মীয়, যিনি ব্যাংকের ভেতরের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানেন না, আমার কাছে জানতে চাইলেন আমার কাজ সম্পর্কে। আমি বললাম, অন্যতম প্রধান কাজ লোন দেয়া ও আদায় করা। তিনি বললেন, যদি আদায় না হয় অর্থাৎ যদি গ্রাহক লোনের টাকা ঠিকমতো ফেরত না দেন, তাহলে কী হবে? আমি বললাম, আমাকে জবাবদিহি করতে হবে, আমাকে ওই টাকা আদায় করতে বলা হবে। তাহলে লোন দিবি না, তার সহজ সমাধান। আমি বললাম তাহলেও আমাকে জবাবদিহি করতে হবে না-পারার বিষয়ে। তিনি বললেন, এ তো দেখি দুই দিকেই বিপদ। এ ঝুঁকি ছাড়াও কিছু চলমান ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ ব্যাংকার হতে গেলে অবশ্যই ঝুঁকি নেয়ার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

উপরের বিষয়গুলোর দিকে তাকালে সহজেই এগুলোকে একপেশে মনে হতে পারে, যা ব্যাংকিংকে পেশা হিসেবে নিতে হয়তো নিরুৎসাহিত করছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, সবাই যেন জেনে-বুঝে এবং পছন্দ করেই ব্যাংকিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ব্যাংকিংকে পেশা হিসেবে নেয়ার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি বা কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে। সত্পথে ভালোভাবে জীবন ধারণের জন্য যে পরিমাণ ব্যয় নির্বাহ করতে হয়, এ পেশা তার অনেকটাই দিতে পারে। এ পেশায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপার্জন যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। দেশের চাকরিজীবী শ্রেণীর মধ্যে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের আয় তুলনামূলকভাবে অনেক উপরের দিকে। সামাজিকভাবেও ব্যাংকারদের একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। ব্যাংকারদের আরেকটি সন্তুষ্টি বা ভালো লাগার বিষয় আছে। ব্যাংকার যখন কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে লোন দেন, তখন ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। ওই প্রতিষ্ঠান যখন বড় হয়, অনেক লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, রফতানি বৃদ্ধি পায়, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে যখন প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রাখে, তখন ব্যাংকার ওই উন্নয়নে কিছুটা হলেও নিজের ভূমিকা খুঁজে নিয়ে আনন্দ পায়। মোদ্দাকথা হলো, জেনে-বুঝে এবং ভালোবেসে যারা ব্যাংকিংকে পেশা হিসেবে নেবেন, তারা নিজেরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি ব্যাংকের জন্যও অন্যতম প্রধান মূলধন হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবেন। দক্ষ ও একান্ত নিবেদিত মানবসম্পদ যেকোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হাতিয়ার। ভুল করে ব্যাংকিং পেশা বেছে নিলে কখনো একান্ত নিবেদিত কর্মী হওয়া সম্ভব নয়।

কার্টেসি: এ বি সিদ্দিকী, ব্যাংকার।