Monday, January 17, 2022

ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা

জনপ্রিয় পোস্ট

নামে-বেনামে অনিয়মে ঋণ বিতরণ ঠেকাতে নতুন করে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ বিতরণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন করে ঋণ দিতে হলে ব্যাংকটির আমানত বৃদ্ধি ও বিতরণ করা ঋণ আদায় বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া ব্যাংকটি নতুন কোনো সিনিয়র কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে পারবে না।

ন্যাশনাল ব্যাংককে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বুধবার (৫ মে) বিষয়টি ঢাকা পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহ্ সৈয়দ আব্দুল বারী। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে একটি চিঠি দিয়েছে। আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। এর বেশি কিছু এখন বলতে পারব না।

ন্যাশনাল ব্যাংকে পাঠানো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্যাংকের ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) ৮৭ শতাংশে না আসা পর্যন্ত ব্যাংকটি কোনো ঋণ বিতরণ করতে পারবে না। বর্তমানে ব্যাংকটির এডিআর অনুপাত ৯২ শতাংশ। ব্যাংকটির আমানত প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা ও ঋণ ৪১ হাজার কোটি টাকা। তাই নতুন ঋণ বিতরণ করতে হলে ব্যাংকটির আমানত বৃদ্ধি ও বিতরণ করা ঋণ আদায় বাড়াতে হবে।

এদিকে ব্যাংকটির বড় অঙ্কের ঋণ ও একক ঋণসীমা বা সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট নতুন করে নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে পরিশোধিত মূলধনের ৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ১৫৩ কোটি টাকার মত বড় অঙ্কের ঋণ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আর একক গ্রাহক ঋণসীমা হবে পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশ বা ৩০৬ কোটি টাকা। এই সীমা নগদ ঋণ (ফান্ডেড) ও ঋণ সুবিধা (নন-ফান্ডেড) ঋণসহ।

এছাড়া পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ব্যাংকটি অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ঋণ অধিগ্রহণ বা কিনতে পারবে না।

ব্যাংকটির শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার ঋণ আদায়ের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে বলা হয়েছে। জানা গেছে, ব্যাংকটির শীর্ষ ২০ গ্রাহকের মধ্যে অন্যতম হলো এস আলম গ্রুপ, মায়শা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, সাদ মুসা, নাফ ট্রেডিং, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, এফএমসি ডকইয়ার্ড, প্রাণ-আরএফএল, ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনাল, ব্রডওয়ে রিয়েল এস্টেট।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংক উপদেষ্টা, পরামর্শক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিম্নতর দুই পদে নিয়োগ দিতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগবে। এর ফলে ব্যাংকটিতে শীর্ষ পর্যায়ে পছন্দের ব্যক্তি চাইলেই নিয়োগ দিতে পারবে না।

এদিকে ঋণ বিতরণে অনিয়ম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) না থাকা, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরিচালনা পর্ষদে শুরু হয় বিবাদ- সব মিলিয়ে অস্থির অবস্থায় ন্যাশনাল ব্যাংক। ব্যাংকটিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে স্থায়ী এমডি নিয়োগের সময় বেঁধে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসময় এমডি নিয়োগ না দিলে আইন অনুযায়ী প্রশাসক বসানো হবে জানিয়েছিল। পরে জরুরি বোর্ড সভা ডেকে শাহ্ সৈয়দ আব্দুল বারীকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ দেয় ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। সৈয়দ আব্দুল বারীকে তিন মাসের জন্য অনাপত্তি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তিনি এসময় ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন। আর ব্যাংকের পর্ষদ আগামী তিন মাসের মধ্যে স্থায়ী এমডি নির্বাচন করবে।

এর আগে দীর্ঘদিন ব্যাংকটির অতিরিক্ত এমডি এ এস এম বুলবুল এমডির চলতি দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাকে সরিয়ে দিতে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানা গেছে, ন্যাশনাল ব্যাংক চলছে অনেকটা সিকদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। দীর্ঘদিন এর চেয়ারম্যান ছিলেন জয়নুল হক সিকদার। গত ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। ২৪ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তার স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার। এরপর কোনো পর্ষদ সভা হয়নি। কিন্তু ঋণ বিতরণ অব্যাহত রাখা হয়েছে, যেখানে বেশকিছু অনিয়মের ইঙ্গিত পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সাধারণত বড় ঋণ বোর্ড সভায় অনুমোদিত হতে হয়)।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, জয়নুল হক সিকদারের মৃত্যুর পর ব্যাংকটি নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছেন পরিচালক রিক হক সিকদার ও রন হক সিকদার। তারা দুজনই জয়নুল হক সিকদারের ছেলে। তবে মেয়ে সংসদ সদস্য (এমপি) পারভীন হক সিকদারসহ অন্য পরিচালকরা চাইছেন নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে। অনিয়ম করে ঋণ বিতরণসহ বিভিন্ন কারণে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যাংকটির পরিচালকদের মধ্যে দুটি পক্ষ হওয়ায় পর্ষদে বিবাদ শুরু হয়।

ন্যাশনাল ব্যাংকের এসব ঘটনা নজরে এলে গত ৫ এপ্রিল বেশকিছু তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া ঋণ বিতরণ না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া রংধনু বিল্ডার্স, দেশ টিভি, রূপায়ণ ও শান্তা এন্টারপ্রাইজের অনুকূলে দেওয়া সব ঋণের দলিলাদি (ঋণ আবেদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত) এবং ঋণের পূর্ণাঙ্গ হিসাব বিবরণীর কপি পাঠাতে বলা হয়। যদিও বিতরণ করা অনেক ঋণের নথি দেখাতে পারছে না ন্যাশনাল ব্যাংক।

ন্যাশনাল ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ব্যাংকটি নতুন করে ৪৫০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। পাশাপাশি সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ১১৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। ঋণের ওপর প্রথম প্রান্তিকে সুদ যুক্ত হয়েছে ৬৫০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকটির ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। তবে তিন মাসে আমানত বেড়েছে মাত্র ৫২১ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকটির ৪০টি শাখা লোকসানে রয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের শেয়ার দীর্ঘ দিন ধরে ফেসভ্যালুর নিচে অবস্থান করছে।

আরও পড়ুনঃ
ন্যাশনাল ব্যাংক চালাচ্ছে কারা?
ঈদের ছুটিতে ব্যাংকসহ চাকরিজীবীদের থাকতে হবে কর্মক্ষেত্রে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ পোস্ট

ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার নিয়োগ দেবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, বেতন ৫০ হাজার

ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড (Dutch Bangla Bank Limited) একটি স্বনামধন্য এবং শীর্ষস্থানীয় বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংক। ব্যাংকটিতে “ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার” পদে...

এ সম্পর্কিত আরও