বেতন না কমিয়ে বিকল্প উপায়ে ব্যাংক খাতে ব্যয় কমানোর চেষ্টা

0

ব্যাংকারদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে বেতনভাতার ওপর হাত দিচ্ছে না বেশির ভাগ ব্যাংক। বিপরীতে বিকল্প উপায়ে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে বছর শেষে মুনাফা একটু কম হলেও মেনে নিতে রাজি বেশির ভাগ ব্যাংক উদ্যোক্তা।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এমনিতেই ঝুঁকি নিয়ে অফিস করছেন ব্যাংকাররা। এরপরও বেতনভাতা কমানো হলে কাজের স্পৃহা হারিয়ে ফেলবেন তারা। এ কারণেই ব্যয় কমানোর বিকল্প পথ বের করতে বেশির ভাগ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিয়েছে। এ দিকে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মনোবলের কথা ভেবে বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত সরে এসেছে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের ইসলামী ধারার অন্যতম প্রতিষ্ঠান আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক। আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়েছে। গত রোববার (২৮ জুন) ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে।

ব্যাংকারদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান গতকাল জানিয়েছেন, আমরা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা কমানোর কথা ভাবছি না। আমরা বিকল্প উপায়ে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছি। যেমন, ভাড়া অফিসগুলোর পরিসর কমিয়ে ভাড়া কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কমানো হচ্ছে নানা ধরনের পরিচালন ব্যয়। প্রয়োজনে যেসব লোকবল স্বাভাবিক অবসরে যাচ্ছেন আপৎকালীন সময়ে এর বিপরীতে নতুন লোকবল নেয়া হবে না। এতে বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর একটু চাপ বাড়লেও বেতন না কমলে মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকবেন তারা। ব্যাংকের বিভিন্ন সম্মেলন কমানো হয়েছে। সব মিলিয়েই আমরা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে বেতনভাতার ওপর হাত না দিয়ে অন্যভাবে সমন্বয় করার চেষ্টা করছি।

পূবালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আব্দুল হালিম চৌধুরী গতকাল জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতে এখনো এমন কোনো সমস্যা হয়নি যে যার কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা কমাতে হবে। তিনি বলেন, করোনাকালীন আমদানি-রফতানি কমে যাওয়ায় বছর শেষে মুনাফা একটু কমে যেতে পারে। কিন্তু এর জন্য যাদের দিয়ে ব্যাংক মুনাফা করবে তাদের কষ্ট দেয়ার কোনো যুক্তি তিনি দেখছেন না।

তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় ব্যয় হলো সুদব্যয়। আমানতের বিপরীতে মুনাফা দিতে হয়। আগে এফডিআরের গড় সুদ ছিল আট শতাংশের ওপরে। এখন তা ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার পরে এত দিন যে সমস্যা হচ্ছিল তা অনেকটা কেটে গেছে। ঋণ ও আমানতের মুনাফার ব্যবধান (ব্যাপ্তি) সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। অপর দিকে, অফিস ভাড়া, নানা ইউটিলিটি বিলও অনেক বেশি রয়েছে। আমরা তা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আগে ব্যাংকের নানা ধরনের কনফারেন্স হতো। এতে একটি ব্যয় হতো। কিন্তু করোনাকালীন কনফারেন্স কমে গেছে। যেটুকু হচ্ছে তার কোনো ব্যয় হয় না। কারণ ভার্চুয়াল কনফারেন্সের কারণে ব্যয় হয় না বললেই চলে। এ কারণে আমরা বিকল্প ব্যবস্থায় ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছি।

এ দিকে করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ব্যাংকারদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটি গত ১৮ জুন পরিচালনা পর্ষদের সভায় ৪০ হাজার টাকা বেশি বেতন পান তাদের ধাপ অনুযায়ী ১০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর মধ্যে ৪০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ, ১ লাখ ১ টাকা থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ, ২ লাখ ১ টাকার ওপরে ২০ শতাংশ, আর ডিএমডিদের বেতন ২৫ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন ১৩ লাখ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা কমিয়ে ৮ লাখ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। বেতন কমানোর এ সিদ্ধান্ত আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গতকাল ব্যাংকটির ৩৪৮তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় এ সিদ্ধান্ত আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এ বিষয়ে ব্যাংকটির একজন পর্ষদ সদস্য গতকাল জানিয়েছেন, করোনার কারণে এমনিতেই ব্যাংকাররা ঝুঁকি নিয়ে অফিস করছেন। এরওপর বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত ব্যাংকারদের মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। যেহেতু ব্যাংকারদের কষ্টের বিনিময়ে ব্যাংকের সব কার্যক্রম পরিচালনা হয়। তাই ব্যাংকারদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। আগামী প্রান্তিকের পর অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বরের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

তবে এ বিষয়ে আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা অন্য কোনো পর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply