ব্যাংকের পাশাপাশি গ্রাহকের করজাল আরো বিস্তৃত হলো

ব্যাংকের করপোরেট করহার কমানোর দাবি ছিল ব্যাংকার ও উদ্যোক্তাদের। একই সঙ্গে দাবি ছিল আবগারি শুল্কসহ গ্রাহকদের ওপর আরোপিত করহার কমানোর। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো করহারই কমেনি, উল্টো ব্যাংক ও গ্রাহকের করজাল আরো বেশি বিস্তৃত হয়েছে।

টেকনো ইনফো বিডি‘র প্রিয় পাঠক: প্রযুক্তি, ব্যাংকিং ও চাকরির গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ টেকনো ইনফো বিডি তে লাইক দিয়ে আমাদের সাথেই থাকুন।

আরও দেখুন:
👉 আগামীকাল ১১ জুন শনিবার পূর্ণ দিবস ব্যাংক খোলা রাখার নির্দেশ
👉 লেনদেনের তথ্য তাৎক্ষণিক জানাতে হবে গ্রাহককে
👉 গ্রাহককে অর্ধ-বার্ষিক ভিত্তিতে লেনদেন বিবরণী পাঠাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ

কোনো গ্রাহকের খেলাপি ঋণ মওকুফ হলে এতদিন মওকুফকৃত ঋণ করমুক্ত ছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতা ব্যতীত অন্য করদাতাদের মওফুককৃত ঋণকে করযোগ্য আয় হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে করযোগ্য আয় ঘোষণা করা হয়েছে, সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে অর্জিত মূলধনি আয়কে। প্রস্তাবিত বাজেট পাস হলে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপরও কর পরিশোধ করতে হবে।

ব্যাংক সুদের উৎসে করহারও বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। বর্তমানে কোম্পানি করদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য সুদের ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে সুদের ওপর এ উৎসে করহার ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাবে গ্রাহকদের স্থিতির ওপর আবগারি শুল্ক আদায় করে সরকার। এটি নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই বড়দের ওপর আবগারি শুল্কহার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ৫ কোটি টাকার বেশি কোনো ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হলে বর্তমানে ৪০ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক কাটা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে এক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক কাটার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের ব্যাংক খাতের জন্য কল্যাণকর কোনো বার্তা নেই। বরং যে বিষয়গুলো নতুন করে সংযোজন করা হয়েছে, তার ফলে ব্যাংক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের বন্ড মার্কেট এখনো সে অর্থে গড়েই ওঠেনি। সরকারি সিকিউরিটিজের আয়কে করযোগ্য ঘোষণার মাধ্যমে বন্ড মার্কেট বিকাশের পথ রুদ্ধ করা হবে। প্রস্তাবিত বাজেট পাস হলে ব্যাংকের গ্রাহকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এর মাধ্যমে ব্যাংক নিয়ে সাধারণ মানুষের ভীতি আরো বাড়বে।

সরকারি সিকিউরিটিজের আয়কে করযোগ্য করার হলে দেশের বন্ড মার্কেটের মৃত্যু হবে বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আমরা চেয়েছিলাম ব্যাংকের করপোরেট করহার কমানো হবে। কিন্তু এখন দেখছি, করহার না কমে বরং ব্যাংকের আয়কে আরো বেশি করজালে আবদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কর আদায়ের পরিধি না বাড়িয়ে যারা কর দেন, তাদের ওপরই আরো বেশি কর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এটি কখনই অর্থনীতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। দেশে এমনিতেই বন্ড মার্কেটের নাজুক অবস্থা। এর মধ্যে বিল-বন্ডের আয়কে করের আওতায় আনা আত্মঘাতী।

গতকাল জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার যে বাজেট ঘোষণা করেছেন, তার মধ্যে ঘাটতি বাজেট ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে ঋণ হিসাবে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা নেয়ার কথা বলেছেন তিনি। ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে এ ঋণ নেয়া হবে।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্যে বলেন, রাজস্ব নীতি সংস্কারের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনয়ন এবং বেসরকারি খাতের করহার যৌক্তিকীকরণ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে উন্নতি সুসংহত করবে বলে আশা করা যায়। এ সংস্কারের আওতায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক খেলাপি ঋণ মওকুফ করা হলে তা বর্তমানে সব করদাতার জন্য করমুক্ত রাখা হয়েছে। এর পরিবর্তে ব্যক্তি করদাতা ব্যতীত অন্যান্য করদাতার খেলাপি ঋণ মওকুফ করা হলে তা করযোগ্য আয় হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করছি। বর্তমানে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে অর্জিত মূলধনি আয় করমুক্ত রয়েছে। এ আয়কে অন্যান্য সিকিউরিটিজের মতো করযোগ্য করার প্রস্তাব করেছেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, কর রাজস্ব আহরণের প্রধানতম খাত হচ্ছে উৎসে কর সংগ্রহ। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। রাজস্ব নীতি প্রণয়নে উৎসে করহার যৌক্তিকীকরণের গুরুত্ব সর্বাধিক। এর ধারাবাহিকতায় বিদ্যমান করপোরেট করহার বিবেচনায় ব্যাংক সুদের উৎসে করহার কোম্পানি করদাতার জন্য ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ এবং রফতানীকৃত পণ্যদ্রব্যের ওপর উৎসে করহার শূন্য ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১ শতাংশে বৃদ্ধির প্রস্তাব করছি। এছাড়া ৫ কোটি টাকার বেশি ব্যাংক স্থিতির ওপর বছরে একবার ৫০ হাজার টাকা অবগারি শুল্ক আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আগে এ স্তরে আবগারি শুল্কের হার ছিল ৪০ হাজার টাকা।

ঘাটতি বাজেট মেটাতে বিদেশী উৎসের পাশাপাশি দেশের ব্যাংক ও অন্যান্য খাত থেকে ঋণ নেয় সরকার। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৬ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। এ ঋণের মধ্যে ২ লাখ ১১ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা নেয়া হয়েছে ব্যাংক খাত থেকে। আর সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য উৎস থেকে ৪ লাখ ৫ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার।

ঋণ নেয়া ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক খাত সম্পর্কে তেমন কিছু নেই বলে মনে করেন ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী। তিনি বলেন, আমরা করপোরেট করছাড় চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, নতুন করে জড়িয়ে যাচ্ছি। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংকের বিষয়ে যেসব নতুন করারোপ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

Leave a Reply

Back to top button