Monday, January 17, 2022

আশার সঙ্গে শঙ্কাও জাগাচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং

জনপ্রিয় পোস্ট

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ২০১৪ সালে চালু হয় এজেন্ট ব্যাংকিং। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে লাইসেন্স নিয়ে এরই মধ্যে ২৮টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। দ্রুত গতিতে সম্প্রসারিত হওয়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তৃতি, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন শেষ পর্ব।

চালু হওয়ার মাত্র ছয় বছরের মধ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা। সেবাটির দ্রুত প্রসার যেমন ঘটছে, সেই সঙ্গে তীব্র হয়ে উঠেছে বাজার দখলের প্রতিযোগিতা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কার আগে কে এজেন্ট নিয়োগ দেবে, তা নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা অনেকটা অস্বস্তিকর পর্যায়ে চলে গিয়েছে। এক ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেটের গা ঘেঁষে আউটলেট দিচ্ছে অন্য ব্যাংক। কোনো কোনো গ্রামের ছোট্ট একটি বাজারে এরই মধ্যে পাঁচ-সাতটি ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেট খুলে বসেছে। বাচ-বিচার না করেই যে কোনো ব্যক্তিকে এজেন্ট নিয়োগ দেয়ায় সেবাটিকে ঘিরে এরই মধ্যে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠতেও শুরু করেছে।

নিয়ম অনুযায়ী এজেন্টদের আউটলেটে টাকা জমার রসিদ থাকার কথা নয়। গ্রাহক টাকা জমা দিলে আউটলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী তা কম্পিউটারের মাধ্যমে সফটওয়্যারে ইনপুট দেবেন। টাকা জমা হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রিন্টার থেকে প্রিন্ট হবে টাকা জমার রসিদ। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক থেকে গ্রাহকের মুঠোফোনে চলে যাবে ক্ষুদে বার্তা। কিন্তু এ নিয়মের ধার ধারেননি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি বাজারে একটি ব্যাংকের এজেন্ট আবুল হোসেন চঞ্চল। নিজেই রসিদ ছাপিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করেছেন। সে অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে নিজের পকেটে পুরেছেন তিনি।

এজেন্ট ব্যাংকিং সেবাকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে বড় প্রতারণার ঘটনা। প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ায় ব্যাংকটির পক্ষ থেকে ওই এজেন্টের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে প্রতারকের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এজেন্ট ব্যাংকিংকে ব্যবহার করে প্রতারণার এটিই একমাত্র ঘটনা নয় বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাংক এশিয়ার লক্ষ্মীপুরের বাঞ্ছানগর এজেন্ট আউটলেটে পাসপোর্টের ফি জমা দেন রাবেয়া বেগম। এজেন্টের দেয়া রসিদ নিয়ে লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্টের আবেদন করেন তিনি। এর কয়েকদিন পর পাসপোর্ট অফিস থেকে তলব করে জানানো হয় আবেদনের সঙ্গে দেয়া রসিদটি ভুয়া। এরপর রসিদটি নিয়ে এজেন্টের কাছে গেলে তিনি ব্যাংকের কলসেন্টারে যোগাযোগ করতে বলেন। কলসেন্টারে যোগাযোগ করলে তাদের কিছু করার নেই জানিয়ে পুনরায় এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়া হয়। এরপর এজেন্ট, কলসেন্টার ও পাসপোর্ট অফিসে দফায় দফায় যোগাযোগ করেও সমাধান পাননি ভুক্তভোগী নারী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাবেয়া বেগমের জমা দেয়া ওই রসিদটি ভুয়া নয়। বরং ওই রসিদের বিপরীতে সিরাজগঞ্জের রবিয়া খাতুন নামের অন্য এক নারীর পাসপোর্ট তৈরি হয়েছে। কীভাবে দুজন গ্রাহকের রসিদ নম্বর এক হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে ব্যবসার নতুন কোনো ধারণা এলেই সবাই একযোগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এরই মধ্যে ২৮টি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের লাইসেন্স নিয়েছে। আরো একাধিক ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের লাইসেন্স নেয়ার কথা ভাবছে। ঠিক একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) সেবার ক্ষেত্রে। বাছবিচার না করেই ২২টি ব্যাংক এমএফএসের লাইসেন্স নিলেও শেষ পর্যন্ত দু-চারটি ছাড়া প্রায় সবাই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। এমএফএসের মতো এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার শৃঙ্খলা যাতে ভেঙে না পড়ে, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।

এ বিষয়ে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, আমরাই দেশে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করেছিলাম। আমরা লক্ষ্য করছি, আমাদের এজেন্টদের গা ঘেঁষে অন্য ব্যাংক এজেন্ট আউটলেট চালু করছে। যেখানে এক-দুটির বেশি আউটলেটের প্রয়োজন নেই, সেখানে অনেকগুলো ব্যাংক আউটলেট দিচ্ছে। এজেন্টরা মুনাফায় না থাকলে সেবাটির বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় এক কিলোমিটারের মধ্যে একটি আউটলেট স্থাপনের বিধান কার্যকর করা দরকার।

যাত্রার ছয় বছরের মধ্যেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২৮টি ব্যাংক লাইসেন্স নিয়েছে। এর মধ্যে সেবাটি চালু করেছে ২৪টি ব্যাংক। এ ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে ১০ হাজার ১৬৩ এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্টরা চালু করেছে ১৪ হাজার ১৬টি আউটলেট। ব্যাংকাররা বলছেন, সংখ্যার বিচারে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আউটলেট সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, বড় বাজারগুলোতে এজেন্ট নিয়োগ দিতে ব্যাংকগুলো প্রতিযোগিতা করছে। অর্থের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে কম, এমন বাজার বা এলাকায় এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার মুনাফার মুখ না দেখায় অনেক এজেন্ট ব্যবসা গুটিয়েও নেয়া শুরু করেছেন।

ব্যাংকভেদে একটি ব্যাংকের এজেন্টশিপ গ্রহণ ও আউটলেট তৈরিতে উদ্যোক্তাদের ১৫-৩০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। আউটলেটগুলো পরিচালনা, ভাড়া পরিশোধসহ অন্যান্য ব্যয় সংযুক্ত করে প্রতি মাসেই এজেন্টদের ব্যয় হচ্ছে ৩০-৫০ হাজার টাকা। নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাব খোলা, আমানত গ্রহণ, অর্থের লেনদেন, রেমিট্যান্স গ্রহণ, বিভিন্ন সেবার মাশুল গ্রহণ, ঋণ বিতরণসহ নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকিং সেবা দিতে পারছেন এজেন্টরা। এসব সেবার বিপরীতে ব্যাংক থেকে এজেন্টরা কমিশন পান। যেমন—প্রতিটি হিসাব খোলার জন্য ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এজেন্টদের কমিশন দিচ্ছে ৩০০ টাকা। আবার প্রতিটি রেমিট্যান্স আহরণের জন্য এজেন্টদের ৫০ টাকা কমিশন দিচ্ছে ব্যাংকটি। এভাবে প্রতিটি সেবার জন্য নির্দিষ্ট হারে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এজেন্টদের কমিশন দিচ্ছে।

তবে ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ কমিশন দিচ্ছে, তাতে পরিচালন ব্যয়ই উঠে আসছে না বলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একাধিক এজেন্ট অভিযোগ করেছেন। নাম প্রকাশ না কারার শর্তে চাঁদপুর জেলায় নিয়োগ দেয়া ব্যাংকটির একজন এজেন্ট বলেন, যে প্রত্যাশা নিয়ে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এজেন্টশিপ নিয়েছিলাম, তা এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। জেলায় নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্টদের মধ্যে আমার অবস্থা বেশ ভালো। তার পরও মাস শেষে পরিচালন ব্যয়ের অর্থই উঠে আসছে না। তাহলে অন্যদের পরিস্থিতি কী, সেটিই অনুমান করা কঠিন নয়।

নতুন নতুন সেবা সংযুক্তির মাধ্যমে এজেন্টদের মুনাফায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান মধুমতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিউল আজম। তিনি বলেন, আমরা প্রায় ৪০০ এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছি। তবে এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা ইউনিয়ন পরিষদের ডিজিটাল সেন্টারকে গুরুত্ব দিয়েছি। এ কারণে আমাদের আউটলেটগুলো অন্য ব্যাংকের থেকে ব্যতিক্রম। এজেন্টরা যাতে মুনাফায় আসতে পারে, তার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত সেবাটিতে নতুন নতুন উপকরণ যুক্ত করছি।

একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর এত নজরদারি সত্ত্বেও পি কে হালদাররা ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী হচ্ছেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা লুটে অনেক গ্রাহক ও ব্যাংকার দেশান্তরী হচ্ছেন। সেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এজেন্টদের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জটিল। তার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে কমপ্লায়েন্স পরিপালনে কঠোর হতে হবে। অন্যথায় সেবাটি দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের বিপদও ডেকে আনতে পারে। বণিক বার্তা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ পোস্ট

ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার নিয়োগ দেবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, বেতন ৫০ হাজার

ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড (Dutch Bangla Bank Limited) একটি স্বনামধন্য এবং শীর্ষস্থানীয় বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংক। ব্যাংকটিতে “ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার” পদে...

এ সম্পর্কিত আরও