এজেন্ট ব্যাংকিং: বাজার দখলে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাঁচ ব্যাংক

0

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ২০১৪ সালে চালু হয় এজেন্ট ব্যাংকিং। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে লাইসেন্স নিয়ে এরই মধ্যে ২৮টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। দ্রুত গতিতে সম্প্রসারিত হওয়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তৃতি, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রথম পর্ব

দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সূচনা হয়েছিল মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইসলাম শেখ ছিলেন দেশের প্রথম এজেন্ট। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে তাকে প্রথম এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছিল ব্যাংক এশিয়া। তবে যাত্রার ছয় বছরের মধ্যে দ্রুতগতিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এ সেবা। এরই মধ্যে দেশে ব্যাংকগুলোর এজেন্টের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশব্যাপী এজেন্ট আউটলেট সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ১৪ হাজারে।

ব্যাংক এশিয়া প্রথম এ সেবা চালু করলেও পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের ২৮টি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বাজার দখলে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। এ ব্যাংকগুলো হলো ব্যাংক এশিয়া, ডাচ্-বাংলা, ইসলামী ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংক।

এজেন্ট আউটলেট চালুর ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে আছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। আর এজেন্টদের মাধ্যমে হিসাব সংখ্যা চালুর ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান দখলে রেখেছে ব্যাংক এশিয়া। তবে এজেন্টদের মাধ্যমে আমানত ও রেমিট্যান্স সংগ্রহে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে ইসলামী ব্যাংক। এজেন্টদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানটি দখলে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকের। এজেন্ট নিয়োগ, নতুন নতুন আউটলেট ও ব্যাংক হিসাব খোলায় একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা করছে অন্য ব্যাংকগুলোও। সেবাটিকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে উদার দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহুরে গণ্ডি ভেঙে দিয়ে এজেটদের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়াটাই দেশের ব্যাংকিং খাতের বড় সফলতা। এর মাধ্যমে স্বল্প সময়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে দেশ কয়েক ধাপ এগিয়েছে। তবে বাজার দখলের নামে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের স্থায়িত্বের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। আবার বেশির ভাগ ব্যাংকের এজেন্টদের কার্যক্রম শুধু আমানত সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ হওয়ায় গ্রামের অর্থ শহরে চলে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে শহর ও গ্রামের মানুষের সম্পদ বৈষম্য বাড়ছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের শৃঙ্খলা ধরে রাখতে এখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।

এজেন্ট ব্যাংকিং ধারণার উত্পত্তি লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে। দ্রুততম সময়ে এ ব্যাংকিং ধারণা ছড়িয়ে যায় চিলি, কলম্বিয়া, পেরু ও মেক্সিকোয়। লাতিন আমেরিকা থেকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তার হয় কেনিয়াসহ আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোতে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়ার এ সেবা চালু হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা বিষয়ে নীতিমালা জারি করে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে পাইলট কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রথম এজেন্ট নিয়োগ দেয় ব্যাংক এশিয়া। এরপর দ্রুততম সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হয়েছে অন্য ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২৮টি ব্যাংক লাইসেন্স নিয়েছে। এর মধ্যে সেবাটি চালু করেছে ২৪টি ব্যাংক। এ ব্যাংকগুলো নিয়োগ দিয়েছে ১০ হাজার ১৬৩ এজেন্ট। নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্টরা ১৪ হাজার ১৬টি আউটলেট চালু করেছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্টদের মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব চালু করেছেন ৮২ লাখ ২১ হাজার ৮৯৩ গ্রাহক। এর মধ্যে নারী গ্রাহকের হিসাব সংখ্যা ৩৭ লাখ ৪৯ হাজার ৮৭টি। এ হিসাবে এজেন্টদের মাধ্যমে ব্যাংক হিসাব খোলা গ্রাহকদের ৪৫ দশমিক ৬০ শতাংশ নারী। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকার আমানত দেশের ব্যাংকিং খাতে যুক্ত হয়েছে। আর ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্টদের মাধ্যমে ৩৮ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় দেশে এসেছে।

এজেন্টদের মাধ্যমে চালু করা ব্যাংক হিসাব গ্রামীণ অর্থায়নের হাতিয়ার হবে বলে মনে করেন ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিং দেশের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এজেন্টদের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ হিসাব খুলছে। এসব ব্যাংক হিসাব গ্রামীণ অর্থায়নের হাতিয়ার হবে। তবে কিছু ব্যাংকের প্রতিযোগিতা সুস্থতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শেষ বিচারে যে ব্যাংকের প্রযুক্তি ও সেবার মান ভালো হবে, তারা টিকে থাকবে। এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার শৃঙ্খলা ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তদারকি বাড়ানো দরকার।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করা ব্যাংকগুলো হলো ব্যাংক এশিয়া, ডাচ্-বাংলা, ইসলামী ব্যাংক, দ্য সিটি, আল-আরাফাহ্? ইসলামী, সোস্যাল ইসলামী, মধুমতি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, এনআরবি কমার্শিয়াল, স্ট্যান্ডার্ড, অগ্রণী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, মিডল্যান্ড, প্রিমিয়ার, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, এবি ব্যাংক, এনআরবি, ব্র্যাক, ইস্টার্ন, ওয়ান, মার্কেন্টাইল, শাহজালাল ইসলামী, এক্সিম ও পদ্মা ব্যাংক।

এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালুর ক্ষেত্রে তৃতীয় ছিল ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। কিন্তু এরই মধ্যে এজেন্ট আউটলেট চালুর ক্ষেত্রে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে ব্যাংকটি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি চালু করেছে ৪ হাজার ২৩৪টি আউটলেট, যা মোট আউটলেটের ৩০ দশমিক ২১ শতাংশ। ব্যাংক এশিয়া ২৮ দশমিক ৬০ শতাংশ আউটলেট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তৃতীয় স্থানে থাকা ইসলামী ব্যাংক চালু করেছে মোট আউটলেটের ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

এজেন্টদের মাধ্যমে হিসাব চালুর ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে আছে ব্যাংক এশিয়া। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি খুলেছে ৩২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৭৫টি ব্যাংক হিসাব। এ হিসাবে এজেন্টদের মাধ্যমে খোলা ব্যাংক হিসাবের ৩৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ ব্যাংক এশিয়ার দখলে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ডাচ্-বাংলা ব্যাংক মোট হিসাবের ৩৩ দশমিক ২৬ শতাংশ খুলেছে। ইসলামী ব্যাংকের এজেন্টদের মাধ্যমে খোলা হয়েছে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ হিসাব।

এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কেউ কারো প্রতিযোগী নয় বলে জানান ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মো. শিরিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আমরা এক ব্যাংক অন্য ব্যাংককে পরিপূরক বলে মনে করছি। দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) আমরাই প্রথম চালু করেছিলাম। কিন্তু অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে এমএফএস সেবার মাধ্যমে ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন হয়নি। সেবাটি এখন শুধু অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হয়ে গেছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকগুলো এ সুযোগ কাজে লাগাবে বলেই মনে করছি।

দেশে ১৫তম ব্যাংক হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু স্বল্প সময়ে ব্যাংকটির এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার বিপুল বিস্তৃতি হয়েছে। এজেন্ট নিয়োগ ও হিসাব খোলার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে থাকলেও আমানত সংগ্রহ ও রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান সবার শীর্ষে। এরই মধ্যে এজেন্টদের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকে ৩ হাজার ৭৯১ কোটি টাকার আমানত জমা হয়েছে, যা মোট আমানতের ২৯ শতাংশ। আমানত সংগ্রহে দ্বিতীয় স্থানে আছে ব্যাংক এশিয়া। এজেন্টদের মাধ্যমে সংগৃহীত মোট আমানতের ১৭ দশমিক ৩১ শতাংশ নিয়ে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক রয়েছে তৃতীয় স্থানে।

ব্যাংকগুলোর মধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণের প্রতিযোগিতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুব উল আলম। তিনি বলেন, কিছুটা পিছিয়ে থেকে আমরা এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু করেছিলাম। কিন্তু স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আমরা ১ হাজার ৮০০ এজেন্ট নিয়োগ দিতে পেরেছি। আমাদের এজেন্টরা এরই মধ্যে মুনাফায় চলে এসেছে। কারণ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসীরা বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। আস্থার শিখরে থাকায় আমাদের এজেন্টদের আমানত সংগ্রহও অন্যদের তুলনায় বেশি। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। এই প্রতিযোগিতা বাজার তৈরির পাশাপাশি তা সম্প্রসারিত করছে।

এদিকে এজেন্টদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকা ব্যাংক হলো ব্র্যাক। ব্যাংকটি ৫৫৩ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে, যা এরই মধ্যে এজেন্টদের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের ৫০ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এজেন্টদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্যাংক হলো ব্যাংক এশিয়া। দ্য সিটি ব্যাংক ঋণ বিতরণের দিক থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। বণিক বার্তা।

Leave a Reply