ঋণ কেলেঙ্কারির পর এখন সুদ মওকুফ চলছে বেসিক ব্যাংকে

0

শুধু ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায়ই লোপাট হয়েছে ব্যাংকের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি হয়ে পড়েছে বিতরণকৃত ঋণের অধিকাংশ। মুনাফারও দেখা নেই টানা কয়েক বছর। এর পরও গ্রাহকদের ঋণের সুদ মওকুফ করে চলেছে বেসিক ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, গত ১০ বছরে প্রায় শতকোটি টাকার সুদ মওকুফ করেছে ব্যাংকটি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত মোট ১০০ কোটি ৫৯ লাখ টাকার সুদ মওকুফ করেছে বেসিক ব্যাংক। এর মধ্যে শুধু গত বছরই মওকুফ করা হয়েছে ২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে বর্তমানে শুধু বেসিক ব্যাংকই লোকসানের ধারায় রয়েছে। গত বছরও ব্যাংকটি পরিচালন বাবদ লোকসান দিয়েছে প্রায় ৩২৫ কোটি টাকা। নিট লোকসান হয়েছে প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাসেম বণিক বার্তাকে বলেন, এসব আগের পর্ষদের আমলে হয়েছে। আমার পর্ষদে এসব যাতে না হয়, সেজন্য নজরদারি বাড়ানো হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সাধারণত সরকারি নির্দেশনার আলোকে ও নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণের ভিত্তিতে ঋণের সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়। এক্ষেত্রে মোট সুদ মওকুফের বিবরণী বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হয়। তবে এক্ষেত্রে কোন গ্রাহকের কী পরিমাণ সুদ মওকুফ করা হলো, সে বিষয়ে তথ্য জানানোর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ব্যাংকগুলো মূলত এ বাধ্যবাধকতা না থাকারই সুযোগ নেয়। পূর্ণ স্বচ্ছতা না থাকায় বিভিন্ন তদবিরে অনেক খারাপ গ্রাহকের সুদ মওকুফ হলেও যাদের জন্য প্রয়োজনীয় তাদের সুদ মওকুফ করা হয় না।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সুদ মওকুফসংক্রান্ত নীতিমালা অনুসরণ করেই ব্যাংকগুলো বিভিন্ন ঋণের বিপরীতে সুদ মওকুফ করে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে কস্ট অব ফান্ড আদায় নিশ্চিত করার পাশাপাশি আয় হিসাব ডেবিট না করেই আরোপিত সুদ মওকুফ করতে হয়। অনারোপিত সুদ মওকুফের বিষয়ে ব্যাংক বা পর্ষদকে প্রতিটি কেসের যথার্থতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এছাড়া খেলাপি ঋণের সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে সুদ মওকুফোত্তর অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা জানান, সুদ মওকুফোত্তর অবশিষ্ট অর্থ আদায়ের পরই সুদ মওকুফ সুবিধা কার্যকর হয়। আবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রাহক মওকুফোত্তর পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে এ সুবিধা বাতিল হয়ে যায়।

বেসিক ব্যাংকের এ সুদ মওকুফ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায় সুদ মওকুফ একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন খাতে অর্থায়ন করে। অনেক সময় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে করা ব্যবসা লাভজনক নাও হতে পারে। আবার অনেক গ্রাহক মারা যেতে পারেন। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়তে পারে। সেসব ক্ষেত্রে ব্যাংকের টাকা পুনরুদ্ধারে অনেক সময় সুদ মওকুফের বিষয় আসে। চাইলেই যেকোনো সুদ মওকুফের সুযোগ নেই। সুদ মওকুফ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা রয়েছে। সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে ব্যাংকের যাতে কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়, সে বিষয়টিও আমলে রাখতে হয়। আর সরকারি ব্যাংক শুধু মুনাফার কথা বিবেচনা করে তৈরি হয়নি। সাধারণ মানুষের প্রতিও কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। এসব জায়গা থেকেই ঋণ মওকুফের সুযোগ দেয়া হয়। এতে দোষের কিছু নেই।

অন্যদিকে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান মনে করছেন, ব্যাংকটি যেভাবে সুদ মওকুফ করেছে তা ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের জন্য কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। ব্যাংকটি একসময় খুব ভালো ব্যাংক ছিল। কিন্তু সুশাসনের অভাবে সে সুনাম ধরে রাখতে পারেনি তারা। ব্যাংকটিতে যেসব অনিয়ম হয়েছিল, সেসব অনিয়ম আরো আগেই কঠোর হাতে দমন করা উচিত ছিল। আবার যারা এসব দোষ করেছে তাদের সে রকম কোনো শাস্তি হয়নি, কোনো দায়ও নির্ধারণ হয়নি। সেটি ব্যাংকিং খাতের জন্য নিন্দনীয়। ব্যাংকটিকে বাঁচাতে এবং গ্রাহকস্বার্থ রক্ষা করতে অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করে দেয়া উচিত।

তিনি বলেন, ব্যাংকটির গ্রাহকস্বার্থ রক্ষা করতে হলে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা ছাড়া বিকল্প নেই। ব্যাংকটির অনেক ভালো ভালো গ্রাহক রয়েছে, তাদের স্বার্থ তো রক্ষা করতে হবে। কিছু লোকের অনিয়মের দায়ে ভালো গ্রাহকদের ভুক্তভোগী করা উচিত নয়। গ্রাহকের স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে।

বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তারাও মনে করছেন, ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ প্রয়োজন। ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে জানান, একসময়ের গর্ব করার মতো ব্যাংকটির আজকের অবস্থা কেন হয়েছে, সেটি সবাই জানে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ করতে হলে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। তা না হলে ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব না। খেলাপি ঋণ আদায়ে একাধিক পদক্ষেপ নেয়া হলেও সেটি কাজ করছে না। ফলে লাভজনক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

লোকসানের বৃত্ত থেকে বেসিক ব্যাংককে বের করে আনার পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাসেম বলেন, ব্যাংকটির অবস্থা ভালো করতে কাজ করছি। ছয় মাসের মধ্যে এর ইতিবাচক পরিবর্তন হবে বলে আশা করি। ব্যাংকটি যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, এজন্য আমরা বেশকিছু নতুন নতুন সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। আগামী ডিসেম্বরে ক্রেডিট কার্ড সেবা দেয়া শুরু হবে। এজেন্ট ব্যাংকিং চালুরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া আমাদের বেশকিছু বাড়তি জনবল রয়েছে। সেসব জনবল কাজে লাগাতে আমরা কিছু সাব-ব্র্যাঞ্চ খোলার চিন্তাভাবনা করছি। এসব উদ্যোগ দৃশ্যমান হলে ব্যাংকের চলমান সংকট অনেকটাই কেটে যাবে।

প্রসঙ্গত, ২০০৯-১২ সালের মধ্যে ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখা থেকে মোট সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে সেটি নিয়ে অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একাধিকবার অনুসন্ধান কর্মকর্তা বদলের পর ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৫৬ জনের বিরুদ্ধে ৫৬টি মামলা করেন দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তারা। যদিও এখন পর্যন্ত একটি মামলারও তদন্তকাজ শেষ করতে পারেনি দুদক। বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কয়েক দফা পর্যবেক্ষণ আসার পর ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নেয়া হয় দুদক। পাঁচ দফায় জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। এ ঘটনায় দুদকের পক্ষ থেকে করা মামলার কোনোটিতেই ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুসহ পরিচালনা পর্ষদের কাউকে আসামি করা হয়নি। মামলার অভিযোগপত্রে তাদের আসামি করা হবে কিনা তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বেই তদন্তকাজ আটকে আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

আবদুল হাই বাচ্চু বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান ২০০৯ সালে। ২০১২ সালে তার নিয়োগ নবায়নও হয়। ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলে ২০১৪ সালে ব্যাংকটির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করার পর আবদুল হাই বাচ্চু নিজেও পদত্যাগ করেন।

Leave a Reply