নতুন বছরে কার্যকর হবে বর্ধিত এডিআর সীমা

0

দেশের প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানতের অনুপাতের (এডি রেশিও) সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৮৫ শতাংশ। গত বছর এ সীমা ১ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও কয়েক দফায় নতুন এডিআর সীমা সমন্বয়ের সময়সীমার ঘোষণা দিয়েও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়েছিল। কিন্তু এবার দেশের সব ব্যাংকের এডিআর সীমা আরো ১ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো আমানতের সর্বোচ্চ ৮৬ ও ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো ৯১ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ করতে পারবে।

এডিআর সীমা বাড়ানো ছাড়াও ঋণের সুদহার কমাতে দেশের ব্যাংকগুলোকে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছাড় পেয়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। এখন থেকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে বেসরকারি ব্যাংকে রাখতে হবে। কর্মীদের গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের (ভবিষ্য তহবিল) অর্থ ছাড়া অন্য যে কোনো উেসর টাকা মেয়াদি আমানত (এফডিআর) হিসেবে রাখতে পারবে না সরকারি প্রতিষ্ঠান। এভাবেই সরকারি আমানতের অর্থ প্রায় বিনা সুদে ব্যাংকগুলোতে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সুদহার কমাতে উৎপাদনমুখী শিল্পে ঋণের সর্বোচ্চ সুদহারও বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে উৎপাদনমুখী শিল্পের সব ঋণের সুদহার হবে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। তবে ঋণখেলাপি গ্রাহক এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্ষদ। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব প্রস্তাবনা পাস হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এসব বিষয় নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বিশেষ সভা আয়োজন করা হয়েছিল গতকাল বিকাল ৪টায়। যদিও কোরাম সংকটের কারণে সভাটি ৫টার পর শুরু হয়। রুদ্ধদ্বার ওই সভা চলে রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। এক্ষেত্রেও রক্ষা করা হয় কঠোর গোপনীয়তা। গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে এ সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান, সাবেক সচিব মাহবুব আহমেদ, একেএম আফতাব উল ইসলাম এফসিএ ও বোর্ড সচিব কাজী ছাইদুর রহমান।

সভার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, উৎপাদনশীল শিল্পের উদ্যোক্তারা এক অংকের সুদে ব্যাংকঋণ পাবেন। ঋণের সুদহার কমাতে আরো কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। ১ জানুয়ারি থেকে সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর হবে।

পর্ষদ সভার সঙ্গে সম্পৃক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, তারল্য সংকট মেটাতে সরকারি আমানতের ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। আগে এ নির্দেশনাটি ছিল ইচ্ছাধীন। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিষয়টির ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করার সুপারিশ করেছে। সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

উন্নয়ন বাজেট, প্রকল্প, নিজস্ব আয়ের তহবিলসহ বিভিন্ন খাত থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এফডিআর হিসাবে রাখত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। এক্ষেত্রে টেন্ডার আয়োজন করে সর্বোচ্চ সুদদাতা ব্যাংককে আমানত দেয়া হতো। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এ প্রবণতার পুরোপুরি লাগাম টেনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে দেশের কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানই নিজেদের কর্মীদের গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ ছাড়া অন্য কোনো অর্থ এফডিআর করতে পারবে না। বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প ও নিজস্ব তহবিলের টাকা বাধ্যতামূলকভাবে এসটিডি (শর্ট টার্ম ডিপোজিট) হিসাবে রাখতে হবে। এ ধরনের আমানতে কোনো সুদ না নেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে।

উৎপাদনশীল শিল্পের ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে অনেক দিন থেকে। এবার এ খাতের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। উৎপাদনশীল শিল্পের চলতি মূলধন ও প্রকল্প ঋণে এক অংকের সুদহারের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। তবে কেবল নিয়মিত গ্রাহকরাই ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। কোনো গ্রাহক খেলাপি হলে ব্যাংক ওই গ্রাহকের ঋণের ওপর অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদ আরোপ করতে পারবে বলে সিদ্ধান্ত এসেছে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, সিঙ্গেল ডিজিট সুদহারের বাধ্যবাধকতার কারণে কোনো কোনো ব্যাংক উৎপাদনশীল শিল্পে ঋণ বিতরণ বন্ধ করে দিতে পারে। বিষয়টি মাথায় রেখে এ বিষয়ে একটি সূচক নির্ধারণ করে দেয়া হবে। গত তিন বছর উৎপাদনশীল খাতে বিতরণ ঋণের গড় হবে এ সূচক। এ খাতে কোনো ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের হার সূচকের নিচে নেমে এলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জরিমানা আরোপ করা হবে।

উৎপাদনশীল শিল্পের ঋণ ছাড়া অন্য খাতে ব্যাংক নিজেদের ইচ্ছামতো সুদ আরোপ করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রেও স্প্রেডের (ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান) সর্বোচ্চ সীমা হবে ৪ শতাংশ। অর্থাৎ, যে সুদে আমানত সংগ্রহ করা হয়েছে, তার সঙ্গে ৪ শতাংশ সুদ যুক্ত করে ব্যাংক ভোক্তাঋণসহ অন্যান্য খাতে ঋণ বিতরণ করতে পারবে।

Leave a Reply