একজন ব্যাংকারের ঈদযাত্রা

0

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। পেশায় একজন ব্যাংকার। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আছে।

টাঙ্গাইল জেলার ভুয়াপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা সংগ্রামী যুবক আলাউদ্দিন। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে হলেও বর্তমানে তার পোষ্টিং চট্টগ্রামে।

কথা বার্তায় মার্জিত ও চালচলনে পরিশীলিত হওয়ায় সে ব্যাংকের গ্রাহকদের নিকট অনেক জনপ্রিয়। শুধু তাই নয়, কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে সে ব্রাঞ্চের অপারেশন ম্যানেজার পদটি অলংকৃত করেছে।

পারিবারিক জীবনে বয়স্ক বাবা মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তার সুখের সংসার। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা মা থাকার কারণে সামর্থ থাকা সত্বেও সে স্ত্রী সন্তানকে নিজের সাথে রাখতে পারে না।

চট্টগ্রামে সে একাই একটি মেসে থাকে। শুক্র শনিবার ছুটি থাকায় দুই বা তিন সপ্তাহ অন্তর অন্তর বাড়িতে যায়।

সামনেই ঈদ। এবারের ঈদটা আলাউদ্দিনের জন্য একটু বেশীই আনন্দদায়ক। কয়েক দিন আগে প্রমোশন হওয়ার কারণে এবার একটি ভালো পরিমানের ঈদ বোনাস পেয়েছে, যা তার আনন্দের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাড়ির সবার জন্য হাত খুলে কেনাকাটা করবে। তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে একটা সাইকেলের জন্য অনেকদিন ধরেই বায়না করছে। ছেলেকে সে কথাও দিয়েছে এবার ঈদে তার স্বপ্নের সাইকেল কিনে দিবে। ছেলেটাও প্রতিদিন ফোন করে জানতে চায়, “বাবা তুমি কবে আসবে?” সাইকেলের জন্য তার যে আর তর সইছে না।

ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সোমবার দিন ঈদ পড়ায় এবার ঈদের ছুটি বেশ ভালো হয়েছে। শুক্র শনি সাপ্তাহিক ছুটি, রবি সোম মঙ্গল ঈদের ছুটি। আলাউদ্দিন পরিকল্পনা করে রেখেছে বৃহস্পতিবার অফিস করে রাতেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে আবার পরের সপ্তাহে বুধ বার এসে অফিস করবে।ঈদের এই সময়টুকু সে খুব হিসেব করে কাজে লাগাবে। বেশির ভাগ সময় কাটাবে তার ছেলে মেয়ের সাথে। দুই বছর বয়সী মেয়েটার জন্য বেশ কিছুদিন তার বুকটা বেশি খা খা করছে। এবার বাড়ি গিয়ে তার মেয়েটাকে অনেকক্ষন বুকে জড়িয়ে ধরে রাখবে। বাবা মার সাথেও একটু সময় দিতে হবে। তাদের বয়স হয়েছে। হায়াত মউত তো আল্লাহর হাতে। কখন কার কি হয়ে যায় বলা তো যায় না। পাঁচ দিন ছুটি হওয়ায় গ্রামের বন্ধুবান্ধব ও পাড়া প্রতিবেশীদের সাথেও একটু দেখা সাক্ষাৎ করার সুযোগ পাবে। ঈদের সময় হওয়ায় প্রায় সবাই গ্রামে থাকবে। ব্যাংকে চাকরি করার কারণে সে অনেকটা অসামাজিকই হয়ে গেছে বলা যায়, কারো সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে না। ভার্সিটির বন্ধুদের সাথে প্রায়ই ডিজিটাল প্লাটফর্মে যোগাযোগ হলেও গ্রামের অনেক বন্ধুই যোগাযোগের বাইরে থাকে, যদিও তাদের সাথে সময় কাটাতেই আলাউদ্দিনের বেশি ভালো লাগে।

বাড়ি যাওয়ার জন্য ট্রেনের টিকেট কাটতে হবে। ঈদের সময় বাসের রাস্তায় অনেক জ্যাম থাকে। ঈদ যাত্রায় নির্ধারিত দিনে ট্রেনের টিকেট কাটতে হয়। আলাউদ্দিন পত্রিকায় তারিখ দেখে নির্ধারিত দিনে ভোর চারটায় চট্রগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে চলে যায়। ঈদের সময় অনেক লম্বা লাইন হয়। লাইনের সামনের দিকে না থাকতে পারলে টিকেট পাওয়া যাবে না, তাই ভোরেই চলে আসা। সকাল আটটায় টিকেট ছাড়ে। বৃহস্পতিবার যেহেতু ঈদের পূর্বে শেষ কর্মদিবস, সেদিন ব্রাঞ্চে অনেক বেশি কাজ থাকবে। কাজ শেষ করে বের হতে দেরি হতে পারে ভেবে আলাউদ্দিন রাত এগারোটার তূর্ণা নিশিতার টিকেট কাটার সিদ্ধান্ত নেয়। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাড়িয়ে আলাউদ্দিন পেয়ে যায় তার কাঙ্খিত বৃহস্পতি বার রাতের তূর্ণা নিশিতার টিকেট। টিকেট হতে পেয়ে আনন্দে চকচক করে উঠে আলাউদ্দিনের চোখ। এটা তার ঈদের অনেক স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ। টাকার চেয়েও অধিক সযত্নে সে টিকেট টা রেখে দেয় মানিব্যাগের সবচেয়ে নিরাপদ কোণে।

টিকেট কাটা শেষ এবার কেনাকাটার পালা। এবার সে বাড়ির সবার জন্য কেনাকাটা করবে। আলাউদ্দিনের বাবা একজন কৃষক ছিলেন। মোটামুটি ভালোভাবে সংসার চললেও ঈদ বোনাস বলে কোন শব্দ তাদের জীবনে ছিলো না। ব্যাংকে চাকুরী করার কারণে আলাউদ্দিনের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আলাউদ্দিনের বাবা আলাউদ্দিনকে সব ঈদে জামা কাপড় কিনে দিতে পারেনি কিন্তু সে তার ছেলেকে সব ঈদেই পোশাক আশাক খেলনা কিনে দিতে পারছে। প্রতিদিন অফিস শেষ করে চিটাগং শপিং কমপ্লেক্স, মিমি সুপার মার্কেট, সেন্ট্রাল প্লাজা, সানমার সিটি ঘুরে ঘুরে সে বাবার ও নিজের জন্য পায়জামা পাঞ্জাবী, মা ও স্ত্রীর জন্য শাড়ী, ছেলে ও মেয়ের জন্য জামা কাপড় কিনে ব্যাগ গুছিয়ে রাখে। কেনাকাটা সব শেষ, এখন শুধু বাকি ছেলের সাইকেল কেনা। ওটা সে ভুয়াপুর থানা সদরে নেমে কিনে নিয়ে যাবে।

অবশেষে বৃহস্পতি বার একটু আগে ভাগেই আলাউদ্দিন ব্যাগপত্র নিয়ে ব্রাঞ্চে চলে যায়। ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস আজ। ব্রাঞ্চে আজ অনেক লোকের সমাগম হবে। যেভাবেই হোক দ্রুত কাজ শেষ করে রাত দশটার মধ্যেই রেল স্টেশনে পৌঁছে যেতে হবে। ঈদ যাত্রায় ট্রেনে উঠতে পারাটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। রাত এগারোটায় তূর্ণা নিশিতা। সকাল ছয় টা থেকে সাতটার মধ্যে বিমান বন্দর স্টেশনে পৌঁছে যাবে। সেখান থেকে বাসে করে ভুয়াপুর। তারপর অটো ভ্যানে করে নিজ গ্রামে। মোটামুটি দুপুর বারোটার মধ্যেই পৌঁছে যাবে। গ্রামের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করবে। গ্রামের অনেক লোকের সাথে দেখা সাক্ষাত ও কুশল বিনিময় করতে পারবে।

লাঞ্চের পর নিবিড় মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিল আলাউদ্দিন। হঠাৎ কাস্টমারদের ভীড়ের মধ্যে থেকে একটা কথা ভেসে আসে আলাউদ্দিনের কানে। কাল ও পরশু না কি ব্যাংক খোলা। সাথে সাথে আলাউদ্দিন প্রথম আলো পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ঢুকে দেখতে পায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বোনাস প্রদানের সুবিধার্থে শিল্প এলাকার সকল ব্যাংকের শাখা শুক্র ও শনিবার পূর্ণ দিবস খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খবরটা দেখে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে আলাউদ্দিনের। তার কয়েক দিন ধরে সাজানো স্বপ্ন মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। শুক্র শনি বার অফিস করতে হলে তাকে শনিবার রাতে যাত্রা শুরু করতে হবে এবং তার অর্জুনা গ্রামে পৌঁছাতে রবিবার সকাল ১০ টা থেকে ১২ টা বেজে যাবে। অন্যদিকে সে তো বৃহস্পতিবারের টিকেট কেটেছে। এখন তো শনিবারের টিকেট পাওয়া যাবে না। বিকেল পাঁচটার দিকে তার ব্যাংকের মানব সম্পদ বিভাগ থেকেও তার ব্রাঞ্চ খোলা রাখার নির্দেশ দিয়ে মেইল চলে আসে। আর আলাউদ্দিনের বুকের ভিতর চলতে থাকে হৃদয় ভাঙ্গার টুং টাং আওয়াজ। আলাউদ্দিন ব্যর্থ মনোরথে ব্যাগপত্র নিয়ে আবার মেসে চলে যায়।

এতো কষ্ট করে রাত জেগে লাইনে দাড়িয়ে কাটা ট্রেনের টিকেট মিস হয়ে গেল। শুক্রবার অফিস শেষ করে আলাউদ্দিন বিভিন্ন বাসের কাউন্টার ঘুরে শ্যামলী পরিবহনে শনিবার রাত সাড়ে দশটার টিকেট কাটে। ওদিকে শুক্রবারে বাড়ি যাওয়ার কথা থাকার পরও বাড়ি না যাওয়ায় তার ছেলে খুব মন খারাপ করে আছে। আলাউদ্দিনের স্ত্রী ফোনে জানায় শুক্রবার থেকেই ছেলে বাড়ির বাইরে গিয়ে বাবা আসার পথে দিকে তাকিয়ে থাকছে।

আজ শনিবার। আজ রাতেই আলাউদ্দিন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে। বাসের টিকেট ঠিকঠাক আছে কি না আরও একবার চেক করে নেয় আলাউদ্দিন। শুক্র শনিবার ব্যাংক খোলা থাকলেও হাতে গোনা তিন চার জন গ্রাহক ছাড়া আর কেউ ব্রাঞ্চে আসে না। দুপুরের পর কোন কাজ না থাকায় মোবাইল থেকে ফেসবুকে ঢুকে ব্যাংকারদের একটি গ্রুপে দেখতে পায় আগামীকাল রবিবার ঈদের আগেরদিন ব্যবসায়ীদের আর্থিক লেনদেন করার সুবিধার্থে বানিজ্যিক এলাকার সকল ব্যাংক রাত আটটা পর্যন্ত খোলা রাখার নির্দেশ। আলাউদ্দিন যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ঈদের আগের রাত আটটা পর্যন্ত কেমনে ব্যাংক খোলা থাকবে! সন্দেহ নিয়ে সে পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে চেক করে দেখে ঘটনা সত্যি। আলাউদ্দিন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তার মোবাইলের পর্দায়। ঈদের আগের রাত আটটা পর্যন্ত অফিস করে দশটায় রওয়ানা হলে তার বাড়িতে পৌঁছাতে কমপক্ষে এগারোটা বেজে যাবে। তার গ্রামের মাঠে ঈদের জামাত হবে সকাল নয়টায়। তবে কি আলাউদ্দিনের ঈদের নামাজ পড়া হবে না? তার বাবার নতুন পাঞ্জাবী, ছেলে মেয়ের নতুন জামা, স্ত্রী ও মায়ের নতুন শাড়ি সবই তো তার ব্যাগে। তাহলে কি পরিবারের কেউ নতুন কাপড় পড়ে ঈদ করতে পারবে না!

বিকেল বেলা মানব সম্পদ বিভাগ থেকে তার ব্রাঞ্চ খোলা রাখার মেইল চলে আসে। আলাউদ্দিন একেবারে স্তব্দ হয়ে গেছে। অথচ তার বুকের ভিতর চলছে যুদ্ধের দামামা আর জ্বলছে চিতার আগুন।

ঈদের আগের রাত আটটা পর্যন্ত অফিস করে আলাউদ্দিন নগরীর বিভিন্ন বাস কাউন্টারে ঘুরতে থাকে। কোথাও কোন বাসে টিকেট পায় না।

বিধ্বস্ত আলাউদ্দিন কদমতলী বাসস্ট্যান্ডের একটি ফুটপাতে বসে পড়ে। সে যে আর ভাবতে পারছে না এখন কি করবে! রাত প্রায় দশটা বেজে যাচ্ছে। এখন বাসে উঠতে পারলেও তার বাড়িতে পৌঁছাতে সকাল এগারোটার বেশি বেজে যাবে। পকেটে তূর্ণা নিশিতার একটি ও শ্যামলী পরিবহনের একটি টিকেট নিয়ে আলাউদ্দিন ফুটপাতে বসে আছে ঢাকা যাওয়ার জন্য। আলাউদ্দিনের দুচোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তার দৃষ্টিতে ভেসে উঠে তার অপেক্ষায় অপেক্ষমান ছেলে মেয়ে স্ত্রী ও বয়স্ক বাবা মার মুখ। চোখ বন্ধ আলাউদ্দিন ভাবে, অলৌকিকভাবে এমন কিছু একটা যদি ঘটে যেতো, যার ফলে সে সকাল সাতটার আগেই বাড়ি পৌঁছে যেতে পারতো! আর আলাউদ্দিনের মনে একটা প্রশ্নই বারবার ঘুরে ফিরে আসছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ঈদের আগের রাত আটটা পর্যন্ত অফিস করাতে পারে, তবে নিজ জেলায় বা পার্শ্ববতী সুবিধাজনক স্থানে পোষ্টিং এর বিধান কেন বাস্তবায়ন করতে পারে না?

(ঈষৎ সংক্ষেপিত)
কার্টেসি: Mafizur Rahman Raju

Leave a Reply