টেকনো ইনফোঃ আসসালামুুু আলাইকুম। প্রিয় বন্ধুরা, আশা করি আপনারা সবাই ভাল আছেন। আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করবো ফেসবুক থেকে নেয়া প্রযুক্তি বিষয়ক একটি পোস্ট আশা করি পোস্টটি আপনাদের ভালো লাগবে।

ভাবতে পারেন এমন এক বিশ্বের কথা, যেখানে আপনাকে কোনো গাড়ি কিনতে হবে না, অথচ শহরের সব গাড়ির মালিকানাই আপনার হবে? না, উবারের কথা বলছি না। উবারে যদিও আপনি চাওয়া মাত্রই গাড়ি পেয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু তার জন্য প্রতিটি যাত্রাতে আপনাকে পৃথকভাবে টাকা গুণতে হচ্ছে। অর্থাৎ উবার বা এই জাতীয় সেবাগুলো মূলত ট্যাক্সি সার্ভিস ছাড়া বেশি কিছু না।

কিন্তু যদি এরকম হয় যে, খুবই স্বল্প পরিমাণ অর্থ দিয়ে মাসিক নিবন্ধনের বিনিময়ে আপনি দিনের যেকোনো সময় শহরের যেকোনো ধরনের গাড়ি ব্যবহার করার সুযোগ পেয়ে গেলেন– শুধু ট্যাক্সি না, মাইক্রো বাস, পাবলিক বাস সহ সব ধরনের যানবাহন? প্রয়োজন হওয়া মাত্রই আপনি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে হাতের কাছেই পেয়ে যাচ্ছেন যেকোনো ধরনের গাড়ি? তাহলে কি আর আপনি গাড়ি কিনবেন? অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, দিনে দিনে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এমন এক বিশ্বব্যবস্থার দিকে, যেখানে ধীরে ধীরে মালিকানার ধারণাটি পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, পরিবর্তিত নতুন বিশ্বে মালিকানার দিন শেষ হয়ে আসছে।

আমাদের চাহিদার কোনো শেষ নেই। আমাদের যা কিছু পছন্দ হয়, ক্রয়ের সামর্থ থাকলে সেটাই আমরা নিজের করে পেতে চাই। আর কোনো কিছু নিজের করে পাওয়ার অর্থই হচ্ছে টাকা দিয়ে সেটা কিনে নেওয়া, সেটার মালিকানা ধারণ করা। মূল্যবান কোনো কিছুর মালিক হতে পারাটা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যার বিলাসবহুল একটি বাড়ি আছে, দামী একটি গাড়ি আছে, সর্বশেষ মডেলের আইফোন আছে, সমাজের চোখে সেই অধিকতর যোগ্য এবং সফল ব্যক্তি। আমাদের মধ্যেও তাই স্বাভাবিকভাবেই এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে যে, একটি আইফোন বা একটি গাড়ির মালিক না হতে পারলে যেন চলবেই না।

মালিকানার ধারণাটি মানব সমাজে শত শত বছর ধরেই ছিল, কিন্তু এটি নতুন মাত্রা পায় বিংশ শতাব্দীতে। শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই দক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থার ফলে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দ্রব্যের চাহিদার চেয়েও অতিরিক্ত যোগানের সম্ভাব্যতা তৈরি হয়। দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্প বিপ্লবের ফলে যখন সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন প্রভৃতি প্রযুক্তি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়, তখন থেকেই আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের মধ্যে এমন এক প্রবণতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় যে, অনেক আপাত অপ্রয়োজনীয় জিনিসও মানুষ নিজের মালিকানায় পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তি মালিকানার অবশ্য কোনো বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি, হয়তো কখনোই সম্পূর্ণ বিকল্প তৈরি হবে না। নিজস্ব গাড়ি না থাকতে পারে, কিন্তু নিজস্ব মোবাইল ফোন না থাকলে আপনি কীভাবে যোগাযোগ করবেন? নিজস্ব জামা-কাপড় না থাকলে আপনি কী পরিধান করবেন? কিন্তু আপনি যদি লক্ষ্য করেন তাহলে দেখতে পাবেন, প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে মালিকানার ধারণা বর্তমানে অনেকটাই পাল্টে গেছে। এবং যে হারে এটার পরিবর্তন ঘটছে, শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই অন্য অনেক জিনিসের মতোই হয়তো আপনি মোবাইল ফোনের মালিকানার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করবেন না।

কখনো কি লক্ষ্য করেছেন, আজ থেকে দশ-পনের বছর আগেও একজন মানুষের সংগ্রহে কতগুলো গানের ক্যাসেট বা সিডি থাকত? আর সেই তুলনায় আপনার সংগ্রহে কতগুলো সিডি আছে? একটা সময় মানুষ ভালো লাগা সবগুলো অ্যালবামের ক্যাসেট বা সিডি নিজের সংগ্রহে রাখার চেষ্টা করত বা বলা যায় সেগুলোর মালিক হওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু যুগের পরিবর্তনে প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে আমরা এখন আর সিডি কেনার প্রয়োজন মনে করি না। আমরা এখন গান শুনি ডিজিটাল মিডিয়াতে।

আমরা যদি কপিরাইটও মেনে চলি, তারপরেও দোকানে গিয়ে সিডি কিনে আনার চেয়ে অনলাইনে টাকা পরিশোষ করে পছন্দের অ্যালবামটি ডাউনলোড করে নিতেই আমরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব। ডিজিটাল মিডিয়ার ব্যবহার জনপ্রিয় হওয়ায় আগেকার দিনের মতো আমরা আর বলতে পারি না যে, আমরা কোনো নির্দিষ্ট একটি অ্যালবামের সিডির মালিক। আমরা এখন টাকা দিয়ে মালিকানা অর্জন করি না, বরং গান শোনার অধিকার অর্জন করি।

অবশ্য আপনি ইচ্ছে করলে দাবি করতে পারেন, নগদ অর্থ দিয়ে ক্রয় করা এই ডিজিটাল বিটগুলোর মালিকানাও আপনার। তবে প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়ে চলছে, তাতে ডিজিটাল ফাইলের মালিকানার প্রতিও মানুষের আগ্রহ অনেকটাই কমে আসছে। উন্নত বিশ্বে মানুষ এখন আর গানের অ্যালবাম বা এমপিথ্রি ফাইলও ডাউনলোড করে না, বরং তারা চাহিদা অনুযায়ী গান শোনে।

সবার হাতে হাতে দ্রুতগতির ইন্টারনেট কানেকশন সম্পন্ন স্মার্টফোন থাকায় গান শোনার জন্য তা মেমোরিতে ডাউনলোড করে সেটির মালিকানা অর্জন করাটা এখন একটি অপ্রয়োজনীয় এবং অলাভজনক ধারণায় পরিণত হচ্ছে। অনেক কম খরচে মানুষ এখন স্পটিফাই জাতীয় সেবার গ্রাহক হতে পারে, যেখানে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের একটি খরচ প্রদানের মাধ্যমে সে কোটি কোটি গান শোনার অধিকার অর্জন করে।

একই কথা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও। উন্নত বিশ্বে খুব কম মানুষই এখন ডিভিডি কিনে সিনেমা দেখে। বরং তারা মাসিক নিবন্ধনের মাধ্যমে নেটফ্লিক্সের গ্রাহক হয় এবং সেখানকার হাজার হাজার সিনেমা এবং সিরিয়ালের মধ্যে যখন যেটা খুশি সেটা দেখার অধিকার অর্জন করে। এ পদ্ধতিতে কোনো গান বা চলচ্চিত্রের সিডি বা ডিভিডির, অথবা ডিজিটাল ফাইলের মালিকানা কিন্তু সে অর্জন করছে না, বরং শুধু সেটা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করার অধিকার অর্জন করছে।

এ ধরনের মালিকানার পরিবর্তে ভাগাভাগির মাধ্যমে সবাই মিলে কোনো জিনিস ব্যবহার করার ধারণা কিন্তু একেবারে নতুন না। এক্ষেত্রে আপনি গ্রন্থাগারের কথা চিন্তা করতে পারেন। আপনি যতো ধনীই হন না কেন, আপনার পক্ষে পৃথিবীর সব বই কেনা সম্ভব না। কিন্তু আপনি খুবই স্বল্প পরিমাণ খরচ দিয়ে কোনো সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের সদস্য হতে পারেন এবং বিনিময়ে যখন খুশি সেখানে গিয়ে পছন্দের বই পড়তে পারেন অথবা নির্দিষ্ট সংখ্যক বই নির্দিষ্টি সময়ের জন্য বাসায়ও নিয়ে আসতে পারেন।

পূর্বে এই পদ্ধতির একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল, প্রয়োজনের সময় হাতের কাছে কাঙ্খিত বইটি পাওয়া যেত না। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এ ধরনের সীমাবদ্ধতা অনেকটাই দূর হয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এমন কোনো সেবা পান, যেখানে নির্দিষ্ট মাসিক খরচের বিনিময়ে প্রয়োজন হলেই লক্ষ লক্ষ ইবুক পড়ার সুযোগ পাবেন, তাহলে কেন অযথা আপনি কয়েক হাজার ইবুক কিনে মেমোরি ভর্তি করবেন?

শুধু গান বা চলচ্চিত্রের মতো বিনোদনমূলক পণ্য না, গাড়ির মতো সার্বক্ষণিক প্রয়োজনীয় একটি মাধ্যমও এখন মানুষের ব্যক্তি মালিকানা হারাতে বসছে। মোবিলিটি অ্যাজ এ সার্ভিস (Mobility as a Service বা সংক্ষেপে MaaS) নামক একটি ফিনল্যান্ড ভিত্তিক উদ্যোগ, যার আওতায় একটি মাত্র অ্যাপের মাধ্যমেই গ্রাহকরা একটি নির্দিষ্ট মাসিক ফির বিনিময়ে শহরের ভেতরে যেকোনো গন্তব্যে যাওয়ার জন্য যেকোনো ধরনের যান ব্যবহার করতে পারবে– ট্যাক্সি, মোটর সাইকেল, বাস, ট্রেন- সব।

এখনও হয়তো আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু সেদিন হয়তো খুব বেশি দূরে না, যেদিন খুব কম মানুষই ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করবে। কারণ, এই বিকল্প সেবাগুলোই তখন হয়ে উঠবে অত্যন্ত সাশ্রয়ী এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য। ব্যক্তিগত গাড়ি শুধু যে কিনতে এককালীন অর্থের প্রয়োজন হয়, তাই না, এর ইন্সুরেন্স, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রভৃতির পেছনেও প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য অর্থ এবং সময় ব্যয় করতে হয়। সেই তুলনায় এই ধরনের ‘অন ডিমান্ড’ সেবাগুলো অনেক বেশি দুশ্চিন্তামুক্ত এবং সাশ্রয়ী হয়ে উঠবে।

প্রত্যেকের একটি করে ব্যক্তিগত গাড়ি থাকা শুধু ব্যক্তির জন্য না, সমাজের এবং পরিবেশের জন্যও অপ্রয়োজনীয় এবং অপচয়। অধিকাংশ মানুষের গাড়িই দিনের বেশির ভাগ সময় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। কিন্তু মানুষ যদি ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ির পরিবর্তে চাহিদা মাফিক গাড়ির সেবা ব্যবহার করা শুরু করে, তাহলে অনেক কম সংখ্যক গাড়ির অনেক দক্ষ এবং কার্যকর ব্যবহার হবে।

প্রযুক্তির যত উন্নতি হতে থাকবে, পৃথিবী যত স্মার্ট হতে থাকবে, বিভিন্ন পণ্যের উপর মানুষের মালিকানা ততই কমতে থাকবে। তার পরিবর্তে একই পণ্য ভাগাভাগি করে ব্যবহার করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আগামীর পৃথিবীটা মালিকানা শূন্য পৃথিবী নিশ্চয়ই হবে না, কিন্তু তা হয়তো হবে স্বল্প মালিকানা বিশিষ্ট পৃথিবী।

সৌজন্যেঃ প্রযুক্তি ও বিশ্ব।

Leave a Reply