টেকনো ইনফোঃ শারমিন আক্তারের চোখে মুখে প্রত্যয়। নতুন দিনের স্বপ্ন আর সম্ভাবনায় কমতি নেই উচ্ছ্বাসেরও। শারমিন একা নন। তার মতোই সোনালী দিনের স্বপ্নে বিভোর সহস্রাধিক কর্মী। কারণ সবাই হতে যাচ্ছেন ইতিহাসের অংশীদার। তাই সপ্তাহ শেষের দিনটিই যেন বাঁধ ভাঙ্গা আনন্দ আর উদ্দীপনার।

শারমিনের মতো সহস্রাধিক কর্মীর নতুন কর্মসংস্থানের বার্তা নিয়ে দেশে প্রথম স্মার্টফোন কারখানার যাত্রা শুরু করলো বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট ওয়ালটন।

‘মেড ইন বাংলাদেশ’-শ্লোগান নিয়ে পরিবেশবান্ধব দেশের প্রথম মোবাইল ফোনের কারখানার যাত্রা সূচনার সাক্ষী হলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম।

বৃহস্পতিবার (৫ অক্টোবর) গাজীপুরের চন্দ্রায় ওয়ালটনের স্মার্টফোন কারখানা উদ্বোধন করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম নিজেও উচ্ছ্বসিত।

বললেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চান আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াবো। আজ তেমন স্বপ্ন পূরণের দিন। আমরা তাদের বলেছি, সহজ কিস্তিতে গ্রাহকের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিতে। তারা যে মান বজায় রেখে হ্যান্ডসেট তৈরি করেছে তা সন্তোষজনক।

কারখানার অত্যাধুনিক প্রোডাকশন ফ্লোরে কথা হয় রোকসানার সাথে। গর্বে বুক ফুলিয়ে বলেন, আমরা প্রস্তুত। এখন আমরা টেক্কা দেবো স্যামসাং আর সিম্ফনির সাথে।

দেশের প্রথম স্মার্টফোন কারখানা উদ্বোধনের পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। ছবি: বাংলানিউজদেশেই ‘লেবেলযুক্ত হ্যান্ডসেট তৈরির দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো আজ। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারি দেশের তালিকায় নাম লেখালাম আমরা, মানে বাংলাদেশ।

ওয়ালটনের সিনিয়র অপারেটিভ ডিরেক্টর উদয় হাকিম বাংলানিউজকে বলেন, দেশে মোবাইল ফোনের মতো হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ চালু হলো। উৎকৃষ্ট মানের এসব ফোন হবে দামে সাশ্রয়ী। যে কারণে সুফল পাবে দেশের জনগণ। লাভবান হবে সরকার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। সাশ্রয় হবে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা। বাড়বে রপ্তানি আয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দেশেই তৈরি হবে এ খাতের দক্ষ জনবল। গড়ে উঠবে আনুষঙ্গিক ব্যাকওয়ার্ড শিল্প। সর্বপরি ফোন ব্যবহারকারীরা সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সর্বশেষ সংস্করণে সাশ্রয়ী মূল্যে পাবেন উন্নত মানের স্মার্টফোন।

‘অচিরেই ফ্রিজ, টেলিভিশনের মতো ওয়ালটন ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতায় থাকা বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোকে হটিয়ে গ্রাহক আস্থার শীর্ষে উঠে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এ উপলক্ষে আয়োজিত ব্রিফিং এ জানানো হয়, ৬টি প্রোডাকশন লাইনে প্রাথমিকভাবে এ কারখানার উ‍ৎপাদন হবে বার্ষিক ২৫ থেকে ৩০ লাখ ইউনিট হ্যান্ডসেট। রয়েছে হ্যান্ডসেটের ডিজাইন ডেভেলপ, গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ, মাননিয়ন্ত্রণ বিভাগ ও টেস্টিং ল্যাব। স্থাপন করা হয়েছে বিশ্বের লেটেস্ট জাপান ও জার্মান প্রযুক্তির মেশিনারিজ।

প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরো ১০টি প্রোডাকশন লাইন স্থাপনের কাজ। পিসিবি (প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড) এর উপর অতি নিঁখুতভাবে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পিন বসিয়ে উচ্চ গুণগতমানের পিসিবিএ বা মাদারবোর্ড তৈরির লক্ষ্যে কারখানায় স্থাপন করা হয়েছে এসএমটি (সার্ফেস মাউন্টিং টেকনোলজি) সিস্টেম। গড়ে তোলা হয়েছে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের পর্যাপ্ত মজুদ।

বলা হয়,ওয়ালটন অগ্রাধিকার দিচ্ছে দেশের অধিকাংশ লোকের ক্রয়সক্ষমতার মধ্যে সাশ্রয়ী মূল্যের স্মার্টফোন তৈরিতে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০ হাজার বর্গফুট জায়গায় গড়ে তোলা এই ইন্ডাস্ট্রিজে ৬টি মডেলের স্মার্টফোন অ্যাসেম্বলিং এর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও আগামী বছর থেকে পূর্ণাঙ্গ হ্যান্ডসেট উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হবে। হ্যান্ডসেটের বডি, চার্জার, ইয়ার ফোন, ব্যাটারি, ইউএসবি ক্যাবলসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশও তৈরি হবে নিজস্ব কারখানায়।

এ ছাড়াও মোবাইল ফোনের ডিসপ্লে, মাল্টি-লেয়্যার মাদারবোর্ড তৈরির প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি শক্তিশালী পণ্য উন্নয়ন ও গবেষণা বিভাগ এবং টেস্টিং ল্যাব। থাকছে শক্তিশালী মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগ। যেখানে উৎপাদিত হ্যান্ডসেটের উচ্চ গুণগতমান নিশ্চিত করা হবে কঠোরভাবে।

ব্রিফিং এ আরো বলা হয়, ওয়ালটনের মতো মোবাইল ফোন কারখানা গড়ে ওঠায় এই খাতের সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভরতা বহুলাংশে হ্রাস পাবে। পাশাপাশি রপ্তানি থেকেও বিশাল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে ব্যাপকভাবে বিকশিত হবে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার শিল্পের মতো ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রিজের। সর্বপরি, এটিকে বলা চলে হাই-টেক শিল্পের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল মাইলফলক।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি ) স্পেকট্রাম ডিভিশনের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিম পারভেজ বাংলানিউজকে জানান, আমাদের কাছে সবার শীর্ষে অগ্রাধিকার পণ্যের গুণগত মান। আমরা দেশে মোবাইল ফোনের কারখানা স্থাপনকে স্বাগত জানাই। আমরা চাই বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা আর গুণগত মানের সক্ষমতায় টিকে থাকুক নিজস্ব ব্র্যান্ড। প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনের জন্য কর ছাড়ের মতো নীতি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে সরকার। তবে আমাদের কিছু শর্ত আছে। তার প্রধান হচ্ছে পণ্যের সর্বোচ্চ মান। কারখানা হতে হবে পরিবেশবান্ধব। থাকতে হবে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

ওয়ালটন এই মান অনুসরণ করায় তারা এ খাতে অগ্রপথিক। বলতে পারেন পথ প্রদর্শক – যোগ করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিম পারভেজ। সুত্রঃ বাংলাদেশ সময়

Leave a Reply